কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৭ ।। ‘‘এবার ‘কলা‘ বুঝায়ে দ্যাও’’

উৎসর্গ
দেশের নিরীহ ভোটারগণকে
নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা কাজলের একটি কৌতুক আজও মনে পড়ে। গল্পটা ছিল এরকম: বড় ভাই তার ছোট ভাইকে নিয়ে বাজারে যায়। ছোটভাই কলা খাওয়ার আব্দার করে, বড়ভাই কিনে দেয়। পরে ছোটভাই আইসক্রিম চাইলে সেটাও কিনে দেয়। এরপর বড়ভাই বলে, “আগে কলা খাও।” কিন্তু হঠাৎ আইসক্রিম দেখে ছোটভাই লাফ দিয়ে বলে, “এবার কলা খাবো না, তুমি এখন কলা বুজায়ে দ্যাও।” কিন্তু কলার বাকল তখন ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়ে গেছে। বড়ভাই অবাক হয়ে ভাবলো, এখন কীভাবে আগের মতো কলা বানিয়ে দিব?
আজকের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও প্রায় একই রকম। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্পষ্ট করে জানিয়েছে—প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কেউ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে জনগণকে আহ্বান করতে পারবে না।
কিন্তু বাস্তবতা কি তা মেনে চলে? মোটেও না। ১১ জানুয়ারি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টা এবং সরকারি কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করেছেন। ফটোকার্ড, ভিডিও বার্তা, জেলা ও উপজেলায় সভা—সবকিছুতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান। এই প্রচারণা চলতে চলতে ১৮ দিন অতিক্রান্ত হয়।
এখন ইসি ঘোষণা দিয়েছে—যারা সরকারি কর্মকর্তা, তারা সরকারি অফিস ব্যবহার করে ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। কিন্তু উপদেষ্টা—যাদের নাম শুনলেই মনে হয় সরকারি কর্মকর্তা—তারা ঘুরে ঘুরে প্রচারণা চালাতে পারবে। অর্থাৎ কলার বাকল ফেলে দেওয়া হয়ে গেছে, আর এখন বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
এখানেই কাজলের কৌতুকের মতো পরিস্থিতি। সেই ছোটভাই যেভাবে কলা খেতে চেয়েছিল, সরকার ও উপদেষ্টারা সেভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইতে শুরু করেছিলেন। এবার ইসি বলছে, “এবার সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আর প্রচারণা যাবে না।” কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রচারণা হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, সেই প্রচারণা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কিভাবে ফিরিয়ে দেবেন? সরকারি কর্মকর্তারা কি ‘কলা’ বুঝিয়ে দিতে পারবেন? উপদেষ্টা ও অন্যান্য ব্যক্তি কি এখনও ‘আইসক্রিম’-এর মতো নতুন প্রলোভনে ভোটারদের দিকনির্দেশ দিতে পারবেন?
আইন ও বাস্তবতার এই দ্বন্দ্ব আজকের মূল ব্যঙ্গ। ইসি কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, ‘‘উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা লিমিট করছি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর। উপদেষ্টা দেশের কর্মচারী নন। সরকারি কর্মকর্তাদের সচেতন করা হচ্ছে, শাস্তি নয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘উপদেষ্টারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে সরকারি কর্মকর্তারা তাদের অফিস ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবে না।’’
তাহলে, উপদেষ্টারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন, সরকারি কর্মকর্তারা পারবেন না। কি অদ্ভূত সিস্টেম! তাহলে উপদেষ্টারা কি সরকারের অংশ নন? সচেতনতা কতটা কার্যকর হবে? যে কলার বাকল আগেই ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই বাকল আর পুরোপুরি জোড়া লাগানো যাবে না।
এদিকে, দেশের সচেতন নাগরিক এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের প্রচারণা দণ্ডনীয়। বিষয়টি যদি আগে থেকে প্রতিরোধ করা যেত, আইনি জটিলতা এড়ানো যেত। কিন্তু প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে, এবং এখন শেষ মুহূর্তে ইসি নির্দেশ দেয়—এটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক ‘কলা বুজানো’-র বাস্তবতা।
কৌতুকের মতো পরিস্থিতি শুধু হাস্যকর নয়, শিক্ষণীয়ও বটে। আগেভাগে নিয়ম মেনে চললে প্রতিটি কলা ঠিকভাবে বোঝানো সম্ভব। কিন্তু যতক্ষণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় না, কলা ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থা চলতেই থাকবে।
শেষে শিক্ষণীয় বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সতর্কতা অপরিহার্য। সরকারি কর্মকর্তারা, উপদেষ্টা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত সবাইকে উচিত স্বচ্ছতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জনগণের প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ। না হলে কাজলের কৌতুকের মতো পরিস্থিতি বারবার তৈরি হবে—কলার বাকল ফেলে দেওয়া, আইসক্রিমের লোভে দৃষ্টি পরিবর্তন, আর বোঝানো অসম্ভব হয়ে ওঠা।
রাজনৈতিক ব্যঙ্গের আড়ালে এটিই প্রকৃত শিক্ষা হলো, সময়মতো আইন মেনে কাজ করলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থির থাকে। কলা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সহজ হয়। আর না হলে, আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয় সেই ছোটভাই-এর বাজারের মতো—কলা আছে, আইসক্রিম আছে, কিন্তু বোঝানো যায় না।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬