জাম্বু ছিলেন সেই ধরনের অভিনেতা, যাকে এক ঝলক দেখলেই গল্পের উত্তেজনা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। কৃষ্ণবর্ণ, বিশাল দেহাকৃতি, টাক মাথা—সব মিলিয়ে তিনি যেন পর্দায় এক জীবন্ত আতঙ্ক। তাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল রুদ্রমূর্তির মতো তীক্ষ্ণ, ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি, আর কর্কশ কণ্ঠস্বর—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের কাছে এক ভয়ংকর অথচ উপভোগ্য চরিত্র।
তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল—অল্প সময়েও প্রভাব বিস্তার করা। একটি দৃশ্যে হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট, কিন্তু সেই উপস্থিতিই পুরো দৃশ্যের ভারসাম্য বদলে দিতে পারত। নায়ক যখন তাঁর হাতে নিগৃহীত, দর্শক শ্বাসরুদ্ধ হয়ে দেখত; আবার নায়ক যখন তাঁকে পরাস্ত করত, তখন হলভর্তি দর্শকের উচ্ছ্বাসে যেন এক ধরনের তৃপ্তি মিলত। এই ‘মার খাওয়ার আনন্দ’—বাংলা সিনেমার সেই সময়ের এক বিশেষ বিনোদন-সংস্কৃতি, যার কেন্দ্রে ছিলেন জাম্বু।
প্রান্তিকতা থেকে রূপালি পর্দায়
এটা ছিল এমন এক সময়, যখন চলচ্চিত্রে চরিত্রভিত্তিক অভিনেতাদের আলাদা মর্যাদা ছিল। গল্পের গঠনই এমন ছিল যে, শক্তিশালী ভিলেন ছাড়া নায়কের বীরত্ব পূর্ণতা পেত না। সেই শূন্যস্থান পূরণে জাম্বু ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
কর্মজীবনের বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য
তাঁকে নায়ক করে ‘নাবালক’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেটি মুক্তি পায়নি—যা হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের এক অপ্রাপ্তির গল্প হয়ে রয়ে গেছে।
জনপ্রিয়তার এক অনন্য ভাষা
জাম্বুর জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল জনজীবনের ভাষাতেও। এক সময় কোনো স্থূলদেহী মানুষকে মজা করে ‘জাম্বুবডি’ বলা হতো—এমনই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। এই ধরনের সামাজিক অভিঘাতই প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না; ছিলেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
ব্যক্তিজীবন ও প্রস্থান
ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক ছিলেন জাম্বু। তাঁর পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে সাধারণ চাকরিতে যুক্ত, আর ছোট ছেলে অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন—যেন উত্তরাধিকারসূত্রে শিল্পের সেই স্রোত বয়ে চলেছে।
জাম্বু হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে কিংবদন্তির আসনে প্রতিষ্ঠিত নন, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান অটুট। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনেক নাম আলোয় থাকে, অনেক নাম হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মুখ থাকে—যারা আলো-অন্ধকারের মাঝামাঝি থেকে যায়, তবু বিস্মৃত হয় না।
জাম্বু তেমনই এক নাম। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সময়ের বিনোদন, উত্তেজনা আর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক শক্তিশালী প্রতীক। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শুধু স্মরণ নয়, বরং এক সময়ের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিকে নতুন করে মনে করারও দিন।