স্মৃতির ভেতর অম্লান এক মুখ প্রয়াত অভিনেতা জাম্বু

স্মৃতির ভেতর অম্লান এক মুখ প্রয়াত অভিনেতা জাম্বু

ভয়েস অব পিপল, বিনোদন ডেস্ক, ৩ মে : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের উপস্থিতি পর্দায় খুব দীর্ঘ না হলেও তাদের ছায়া দীর্ঘস্থায়ী। তেমনই এক নাম—জাম্বু। ২০০৪ সালের ৩ মে, ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।

আশি ও নব্বই দশকের বাণিজ্যিক অ্যাকশন চলচ্চিত্রের এক অপরিহার্য খলঅভিনেতা, যিনি তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি, ভয়ংকর দৃষ্টি এবং অনন্য অভিনয়ভঙ্গির মাধ্যমে দর্শকের মনে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর প্রস্থান ছিল নীরব, অনেকটা তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের মতোই—অপ্রচারে ঢাকা।

জাম্বু ছিলেন সেই ধরনের অভিনেতা, যাকে এক ঝলক দেখলেই গল্পের উত্তেজনা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। কৃষ্ণবর্ণ, বিশাল দেহাকৃতি, টাক মাথা—সব মিলিয়ে তিনি যেন পর্দায় এক জীবন্ত আতঙ্ক। তাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল রুদ্রমূর্তির মতো তীক্ষ্ণ, ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি, আর কর্কশ কণ্ঠস্বর—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের কাছে এক ভয়ংকর অথচ উপভোগ্য চরিত্র।

তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল—অল্প সময়েও প্রভাব বিস্তার করা। একটি দৃশ্যে হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট, কিন্তু সেই উপস্থিতিই পুরো দৃশ্যের ভারসাম্য বদলে দিতে পারত। নায়ক যখন তাঁর হাতে নিগৃহীত, দর্শক শ্বাসরুদ্ধ হয়ে দেখত; আবার নায়ক যখন তাঁকে পরাস্ত করত, তখন হলভর্তি দর্শকের উচ্ছ্বাসে যেন এক ধরনের তৃপ্তি মিলত। এই ‘মার খাওয়ার আনন্দ’—বাংলা সিনেমার সেই সময়ের এক বিশেষ বিনোদন-সংস্কৃতি, যার কেন্দ্রে ছিলেন জাম্বু।

প্রান্তিকতা থেকে রূপালি পর্দায়

জাম্বুর প্রকৃত নাম ছিল শুকলাল বাবু, আরেক নামে পরিচিত ছিলেন বাবুল গোমেজ হিসেবে। দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের প্রান্তিক জীবন থেকে উঠে এসে ঢাকায় কাজের সন্ধানে পা রাখেন তিনি। সেখানেই ঘটনাক্রমে যুক্ত হন চলচ্চিত্রের সঙ্গে—এবং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাণিজ্যিক সিনেমার এক অপরিহার্য মুখ।

এটা ছিল এমন এক সময়, যখন চলচ্চিত্রে চরিত্রভিত্তিক অভিনেতাদের আলাদা মর্যাদা ছিল। গল্পের গঠনই এমন ছিল যে, শক্তিশালী ভিলেন ছাড়া নায়কের বীরত্ব পূর্ণতা পেত না। সেই শূন্যস্থান পূরণে জাম্বু ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

কর্মজীবনের বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য

অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জাম্বু গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল কর্মভাণ্ডার। ‘এক মুঠো ভাত’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘রক্তের দাগ’, ‘অঙ্গার’, ‘শেষ পরিচয়’, ‘সন্ত্রাস’, ‘অগ্নিপুরুষ’, ‘বনবাসে বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’—এমন অসংখ্য ছবিতে তিনি বিভিন্ন মাত্রার খলচরিত্রে অভিনয় করেছেন। কখনো প্রধান ভিলেন, কখনো সহযোগী খলনায়ক—কিন্তু প্রতিটি ভূমিকাতেই ছিল তাঁর নিজস্ব ছাপ। বিভিন্ন ফ্যান্টাসি ছবিতে ‘দৈত্যের’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন জাম্বু। তার সেই বিখ্যাত ডায়লগ ছিল ‘হুকুম করুন মালিক’।
এত বড় বিশালদেহী মানুষ হলেও তার কন্ঠ ছিল ফ্যাশফ্যাসে। তাই তার হয়ে কন্ঠ দিতেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র বিজ্ঞাপন কন্ঠ ‘মাযহারুল ইসলাম’। লন্ডনের ইয়র্ক হলের এক  অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে মাযহারুল নিজেই এ তথ্য দিয়েছিলেন।

তাঁকে নায়ক করে ‘নাবালক’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেটি মুক্তি পায়নি—যা হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের এক অপ্রাপ্তির গল্প হয়ে রয়ে গেছে।

জনপ্রিয়তার এক অনন্য ভাষা

জাম্বুর জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল জনজীবনের ভাষাতেও। এক সময় কোনো স্থূলদেহী মানুষকে মজা করে ‘জাম্বুবডি’ বলা হতো—এমনই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। এই ধরনের সামাজিক অভিঘাতই প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না; ছিলেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।

ব্যক্তিজীবন ও প্রস্থান

ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক ছিলেন জাম্বু। তাঁর পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে সাধারণ চাকরিতে যুক্ত, আর ছোট ছেলে অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন—যেন উত্তরাধিকারসূত্রে শিল্পের সেই স্রোত বয়ে চলেছে।

জাম্বু হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে কিংবদন্তির আসনে প্রতিষ্ঠিত নন, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান অটুট। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনেক নাম আলোয় থাকে, অনেক নাম হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মুখ থাকে—যারা আলো-অন্ধকারের মাঝামাঝি থেকে যায়, তবু বিস্মৃত হয় না।

জাম্বু তেমনই এক নাম। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সময়ের বিনোদন, উত্তেজনা আর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক শক্তিশালী প্রতীক। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শুধু স্মরণ নয়, বরং এক সময়ের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিকে নতুন করে মনে করারও দিন।