ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৬ ।। দেশে এলো পারমাণবিক যুগ : জনগনের কি আসবে সুখ?
“উৎসর্গ:
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের পথে যাত্রাকে এগিয়ে নেওয়া সকলের প্রতি”

বাংলাদেশ গত মাসে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অর্জন কি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে, নাকি নতুন ধরনের ঝুঁকির সঙ্গে আমাদের বসবাস শিখতে হবে? রূপপুর প্রকল্প নিজেই এক দ্বৈত বাস্তবতার দরজা খুলে দেয়। একদিকে অগ্রগতির উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে সংশয়ের ছায়া।

পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবতার সূচনা হলো। ২৮ এপ্রিল ২০২৬ দুপুর আড়াইটায় অতিথিদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান বিকেল সাড়ে তিনটায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে নতুন ধাপে প্রবেশ করে। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ফকির মাহবুব আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আরিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Rosatom-এর মহাপরিচালক Alexei Likhachev উপস্থিত ছিলেন।
এই জ্বালানি লোডিং আসলে নির্মাণ পর্ব থেকে কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে প্রবেশের সূচনা। পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর প্রকল্প যেন বহুদিন ধরে এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল—আজ সেই প্রতীক্ষার অবসান।
ইতিহাস: স্বপ্ন, স্থবিরতা, পুনর্জাগরণ
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৬১ সালে প্রথম পরিকল্পনা হলেও স্বাধীনতার পর নানা কারণে তা থেমে যায়। এরপর বহু বছর এটি কেবল সম্ভাবনার আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। ২০০৯ সালের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে নিয়ে আসে এবং দীর্ঘদিন স্থবির থাকা রূপপুর প্রকল্পকে পুনরায় সক্রিয় করে।

এই সময়ই পারমাণবিক বিদ্যুৎকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। ২০১১ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Rosatom-এর সঙ্গে আন্তঃসরকার চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়নের প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এরপর ঋণচুক্তি, প্রযুক্তি নির্বাচন এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়।

২০১৩ সালে প্রাথমিক নির্মাণ শুরু এবং ২০১৭ সাল থেকে পূর্ণমাত্রার কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত—সবই এই সময়কালের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ ছিল। সমর্থকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগের পথ খুলে দেয়, যা আজ বাস্তব উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রকল্পের বাস্তবতা: শক্তি ও সম্ভাবনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে। দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এটি দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। বিদ্যুৎ ঘাটতি কমবে, উৎপাদন বাড়বে, অর্থনীতিতে গতি আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা।
পরিবেশগত দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কয়লা ও গ্যাসের তুলনায় অনেক কম কার্বন নিঃসরণ করে পারমাণবিক শক্তি, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু প্রশ্নও আছে: পরিবেশ ও নিরাপত্তা
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও অস্বীকার করা যায় না।
রেডিওঅ্যাকটিভ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। এই বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে না পারলে পরিবেশ ও মানুষের জন্য তা বিপজ্জনক হতে পারে।
দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম হলেও শূন্য নয়—এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
পদ্মা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার এবং তাপ দূষণের সম্ভাবনাও পরিবেশবিদদের ভাবাচ্ছে।
যদিও International Atomic Energy Agency (IAEA)-এর মানদণ্ড অনুসরণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে, তবুও বাস্তব প্রয়োগই হবে মূল পরীক্ষা।
কীভাবে কাজ করবে এই পারমানবিক শক্তি ?
রূপপুরের রি-অ্যাক্টরে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করবে।
প্রথম ইউনিটে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে পরীক্ষা শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে এবং কয়েক মাসের মধ্যে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
একবার জ্বালানি লোড করলে কেন্দ্রটি টানা দেড় বছর চলতে পারবে। এর আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা বাড়িয়ে ৯০ বছর করা সম্ভব।
অর্থনীতি ও মানুষের প্রত্যাশা
এই প্রকল্পে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শিল্প উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটা আরও সরল—বিদ্যুৎ কি সাশ্রয়ী হবে? জীবনযাত্রার খরচ কি কমবে? উন্নয়নের সুফল কি ঘরে ঘরে পৌঁছাবে?
পারমাণবিক শক্তির অন্ধকার অধ্যায়: বিশ্ব অভিজ্ঞতা
এখানেই আসে সবচেয়ে সংবেদনশীল বাস্তবতা। পারমাণবিক শক্তি যেমন সম্ভাবনার, তেমনি ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনারও সাক্ষী।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দুর্ঘটনা, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমান ইউক্রেন)। সেখানে রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরণে বিপুল পরিমাণ রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ স্থানচ্যুত হয়, দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, এবং পুরো অঞ্চল আজও সীমিতভাবে বসবাসযোগ্য।
এরপর ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক কেন্দ্র সুনামির আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রের পানি প্রবেশ করে রিঅ্যাক্টর কুলিং সিস্টেম অচল হয়ে পড়ে, ফলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে এবং লক্ষাধিক মানুষ সরিয়ে নিতে হয়।
১৯৭৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনাও ছিল আরেকটি বড় সতর্কবার্তা, যেখানে রিঅ্যাক্টর আংশিক গলে গিয়ে তেজস্ক্রিয় গ্যাস লিক করে।
এই ঘটনাগুলো দেখায়—পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও, একটি বড় ভুল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ হলেও “ঝুঁকি শূন্য” কখনোই হয় না। তাই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল এবং স্বচ্ছ তদারকি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশ পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করলো বলে কি জনগনের সুখ নিশ্চিত হয়ে গেলো? এখানে বলা যায়, আমরা কেবল একটি শক্তিশালী প্রযুক্তির দরজা খুলেছি, যা উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই শক্তির ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়াবহ দায়িত্বও।
চেরনোবিল, ফুকুশিমা কিংবা থ্রি মাইল আইল্যান্ড আমাদের শেখায়—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, নিরাপত্তা ও মানবিক সতর্কতা কখনোই উপেক্ষা করা যায় না।
অতএব পারমাণবিক যুগে প্রবেশই শেষ কথা নয়—আসল পরীক্ষা শুরু এখনই: আমরা এই শক্তিকে কতটা নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারি।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৩ মে ২০২৬