ট্রাম্প বনাম নিজ সরকার: ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা ঘিরে আমেরিকায় নতুন বিতর্ক
ভয়েস অব পিপল, বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৩ মে:
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবার এক অভূতপূর্ব ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নিজের সরকারের বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেছেন, যা ওয়াশিংটনের বিচারব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রাম্পের অভিযোগ, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ তার ব্যক্তিগত কর সংক্রান্ত তথ্য নিয়ম ভেঙে ফাঁস করে দেয়, ফলে তার গুরুতর মানহানি হয়েছে। এই ক্ষতির জন্য তিনি সরকার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। তবে এই মামলার সবচেয়ে জটিল দিক হলো—যে বিচার বিভাগ মামলাটি পরিচালনা করবে, সেটি তারই নিয়োগকৃত অ্যাটর্নি জেনারেলের অধীন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কি নিজেই সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলায় ট্রাম্পের পক্ষ নেবে, নাকি জনস্বার্থ রক্ষায় তার বিরুদ্ধেই অবস্থান নেবে?
এর মাত্র একদিন পরই যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কমি-এর বিরুদ্ধে পৃথক একটি মামলা দায়ের করেছে। অভিযোগ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেন যেখানে ঝিনুকের খোলসে “৮৬৪৭” লেখা ছিল। মার্কিন রাজনৈতিক পরিভাষায় “৮৬” শব্দটি কাউকে সরিয়ে দেওয়া বা হত্যার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর “৪৭” বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে এটি ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে হত্যার ইঙ্গিত ছিল। তবে মামলার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, ওই পোস্টটি প্রায় এক বছর আগে করা হয়েছিল এবং প্রকাশের একদিন পরই তা মুছে ফেলেন কমি।
বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক The New York Times-সহ একাধিক গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি সত্যিই ফৌজদারি অভিযোগের পর্যায়ে পড়ে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে জেমস কোমির দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন কোমি, যা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে এসে ট্রাম্প আবারও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন, যদিও আগেরবার আদালত অভিযোগ গ্রহণ করেনি।
এবার নতুন অভিযোগ হিসেবে “হত্যাচেষ্টা” যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আবার আদালতে গড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ পরস্পর স্বাধীন ও সমান ক্ষমতার অধিকারী হলেও বাস্তবে সেই ভারসাম্য ক্ষয়ে গেছে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা—বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা—অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে কিছু রক্ষণশীল চিন্তাবিদ “একক নির্বাহী তত্ত্ব” (Unitary Executive Theory) তুলে ধরছেন, যেখানে বলা হয়—রাষ্ট্রের সব নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু প্রেসিডেন্ট। তবে সমালোচকদের মতে, এই ব্যাখ্যা কার্যত প্রেসিডেন্টকে রাজা-সদৃশ ক্ষমতার দিকে ঠেলে দেয়, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রভাবশালী পর্যবেক্ষকরা ইতিমধ্যে ট্রাম্পের এই ক্ষমতাচর্চাকে “অসীম নির্বাহী ক্ষমতা” হিসেবে বর্ণনা করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ তাকে “ম্যাড কিং” বলেও উল্লেখ করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল একটি তুলনা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—এই ধারা কোথায় গিয়ে থামবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাস বলছে—ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা তুর্কমেনিস্তানের সাপারমুরাত নিয়াজভ রাষ্ট্রকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতীকে রূপান্তর করেছিলেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সব কাঠামো ভেঙে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই কেন্দ্রীকরণ ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই মামলা ও পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, সংবিধান ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক নতুন প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে—যার উত্তর সময়ই দিতে পারে।