সিলেটে শ্রমিকবাহী পিকআপে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত : ৩ মাসে ৮৩ জন নিহত
সিলেট প্রতিনিধি:
সিলেটে ভোরের শান্ত আকাশ মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে উঠল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। জীবিকার তাগিদে বের হওয়া একদল শ্রমিকের যাত্রা শেষ হলো মৃত্যু আর আর্তনাদের মধ্যে।
শনিবার ভোরে সিলেট নগরী থেকে ২৫ জন নির্মাণশ্রমিককে নিয়ে একটি পিকআপ রওনা দেয় গোয়ালাবাজারের উদ্দেশ্যে। তাদের লক্ষ্য ছিল একটি ভবনের ঢালাইয়ের কাজ। প্রতিদিনের মতোই ছিল এই যাত্রা—কিন্তু কেউ জানত না, এটি হবে অনেকের জীবনের শেষ পথচলা।
ভোর প্রায় ৬টার দিকে তেলিবাজারের সুনামগঞ্জ বাইপাস এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে পিকআপটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয়বিদারক চিৎকার।
দুর্ঘটনার পরের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। সড়কের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিলেন নিহত ও আহত শ্রমিকরা। অনেকেই তখনও জীবনের জন্য ছটফট করছিলেন। ছোট একটি পিকআপে গাদাগাদি করে ২৫ জন মানুষ, সঙ্গে ভারী ঢালাই মেশিন—সংঘর্ষের পর সেই মেশিনই যেন হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ। অনেক শ্রমিক মেশিনের চাপায় প্রাণ হারান।
তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়রা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট এসে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। আহতদের দ্রুত সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। শেষ পর্যন্ত এ দুর্ঘটনায় মোট ৮ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর এবং সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা। তাদের মধ্যে দুই সহোদর ভাই আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিনের একসঙ্গে মৃত্যু এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এনেছে।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের মধ্যে রহিম নামের একজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেকের আঘাত গুরুতর হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই পিকআপ ও ট্রাকচালক পলাতক রয়েছেন। ইতোমধ্যে ট্রাকের হেলপারকে আটক করা হয়েছে এবং চালকদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সিলেট বিভাগের ভয়াবহ সড়ক বাস্তবতা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই এ অঞ্চলে ৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৮৩ জনের। কেবল মার্চ মাসেই ২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩২ জন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি হতাহত হচ্ছেন মোটরসাইকেল আরোহী ও সাধারণ যাত্রীরা।
ভোরের সেই যাত্রা ছিল জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পরিণত হলো এক শোকাবহ মৃত্যু মিছিলে। প্রশ্ন এখনো একই—কবে নিরাপদ হবে দেশের সড়ক, কবে থামবে এই অবিরাম প্রাণহানি?