বাংলাদেশ সংবাদ
লুটের ১,৩১০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, অপরাধীদের হাতে যাওয়ার শঙ্কা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৩ সেপ্টেম্বর:
গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৩টি উদ্ধার হয়েছে। তবে ১ হাজার ৩১০টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধীদের হাতে পৌঁছে বিক্রি, ভাড়া ও বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের ২৫ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ১০৯টি চায়না রাইফেল, একটি বিডি রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ চায়না পিস্তল, ৪৪৩টি ৯ এমএম পিস্তল, ৩৮৪টি ১২ বোর শটগান, ১২৮টি গ্যাস গান, সাতটি গ্যাস লাঞ্চার এবং দুটি ২৬ মিমি সিগন্যাল পিস্তল।
অস্ত্রের পাশাপাশি এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০টি গুলি, ১১ হাজার ৩৯১টি টিয়ার গ্যাস সেল, ২৯১টি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, ১ হাজার ১৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৪১টি কালার স্মোক গ্রেনেড, ২২টি সেভেন/মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ২৮৪টি ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড এবং ১১৬টি হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে।
এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সরঞ্জাম এখনো উদ্ধার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের অবস্থান অজানা থাকায় সেগুলো অপরাধীদের হাতে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
যেভাবে অপরাধীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে
ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রথম উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ২ মার্চ ২০২৬। রাজধানীর স্বামীবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে গুলি করার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল ও একটি রিভলবার উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে আরও অস্ত্র উদ্ধার হয়। এর মধ্যে চারটি অস্ত্র ওয়ারী থানা থেকে লুট হওয়া বলে শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে উঠে আসে, লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের কাছে বিক্রির পাশাপাশি ভাড়ায়ও দেওয়া হচ্ছিল। এতে লুটের অস্ত্রকে ঘিরে একটি অবৈধ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার চিত্র সামনে আসে।
এরপর ১৮ এপ্রিল ২০২৬, রাজধানীর গাবতলী এলাকায় একটি স্পোর্টস কার থামিয়ে এক যুবককে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন। তদন্তকারীরা দেখতে পান, অস্ত্রটিতে ব্রাজিলে তৈরি হওয়ার চিহ্ন রয়েছে এবং সেটি পুলিশের ব্যবহৃত সেমি-অটোমেটিক ৯ এমএম পিস্তলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অস্ত্রটি ঠিক কোন থানা বা সংস্থা থেকে লুট হয়েছিল, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে সামনে আনে।
এরপর ২৯ আগস্ট ২০২৬, শনিবার রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তথ্যের গুরুত্ব অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার কথা জানানো হয়।
এর পরদিন ৩০ আগস্ট ২০২৬, রবিবার সন্ধ্যায় গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেক এলাকায় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে এক নারীসহ তিনজন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি গুলির খোসা। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযান জোরদার
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এতে এন্টি টেরোরিজম ইউনিট, স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সহযোগিতা করছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এখন শুধু অস্ত্র উদ্ধার নয়, এসব অস্ত্রের সরবরাহচক্র শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। কোন অস্ত্র কোথা থেকে লুট হয়েছে, কার হাতে গেছে, কে তা বিক্রি বা ভাড়া দিয়েছে এবং কোথায় ব্যবহার হয়েছে—এসব তথ্য বের করা না গেলে লুটের অস্ত্রের অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।