বাংলাদেশের সমসাময়িক বিষয়ের উপর কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৭।। যারা এখন দেশের সরকার: আকাশ থেকে মাটিতে নামা ভীষণ দরকার

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৭।। যারা এখন দেশের সরকার: আকাশ থেকে মাটিতে নামা ভীষণ দরকার

উৎসর্গ:


সরকারি পে-স্কেলের বাইরে থাকা সেই কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষের প্রতি,

যাঁদের ঘামেই দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে--

যাঁরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান,

কিন্তু সেই চাকায় বসার সুযোগ পান না—সেই মাটির মানুষদের।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বড় বেতন বৃদ্ধির আলোচনা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে চাকরি হারানো, কারখানা বন্ধ, ব্যাংকে তারল্য সংকট, ব্যবসায় মন্দা, প্রায় প্রতিদিন খুন, নারীদের উপর নির্যাতন,বিদ্যুৎ-গ্যাসের ঘাটতি ও সর্বত্র চাঁদাবাজির অভিযোগ। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক—রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার আসলে কোথায়?

সর্বশেষ ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ এসেছে। এতে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে। সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ১৪ লাখ। বিপরীতে দেশের মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৬ কোটি ৯১ লাখ; এর প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাঁদের অধিকাংশের জন্য নেই কোনো পে-স্কেল, নেই চাকরির নিশ্চয়তা, নেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয় সমন্বয়ের নিশ্চয়তা।

এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয় শ্রমবাজারের দিকে তাকালে। দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ, যার মধ্যে স্নাতক ও উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রায় ৯ লাখ। শিল্প ও পোশাক খাতে উৎপাদন কমেছে, বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। গ্যাসের অভাবে কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না; বিদ্যুৎ সংকটও উৎপাদন ব্যাহত করছে। রিকশাচালক, দোকানদার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বড় ব্যবসায়ী—চাহিদা ও আয় কমে সবার ওপর চাপ বাড়ছে।

ব্যাংকিং খাতেও সংকট আছে। কয়েকটি ব্যাংকে তীব্র তারল্য সমস্যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহায়তা দিতে হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির একদিকে টাকা ঘাটতি, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট। তার ওপর ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি তাঁদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ঘাড়েই চাপছে।

এমন পরিস্থিতিতেই সামনে আসছে বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা ও বিমান কেনার পরিকল্পনা। চীন থেকে ২০টি J-10CE যুদ্ধবিমান কিনতে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি যাত্রীবাহী বিমান কেনার চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতিরক্ষা ও বিমান পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই মুহূর্তে অগ্রাধিকারটা কি ঠিক আছে?

চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনা হচ্ছে। তাহলে কি বাংলাদেশ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? যদি তাই হয়, কার সঙ্গে? আর যুদ্ধ শুধু বিমান দিয়ে চালানো যায় না—লাগে জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা, শিল্প উৎপাদন ও শক্তিশালী অর্থনীতি। যে দেশের কারখানা গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয় এবং মানুষের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত, সেই দেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বিনিয়োগ হয়তো আগে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই।

বোয়িং কেনার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি ভিন্ন নয়। নতুন বিমান আকাশে উড়বে, যাত্রী বহন করবে—এতে আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু যে গার্মেন্টস শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যে ব্যবসায়ী লোকসানে, যে রিকশাচালক সংসারের খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন—তাঁরা কি সেই নতুন বোয়িংয়ে চড়ে বিদেশে হাওয়া খেতে যাবেন?

সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই দেশের বেসরকারি কর্মী, শ্রমিক ও স্বনিয়োজিত মানুষের আয় যদি স্থবির থাকে বা কাজই না থাকে, তাহলে শুধু সরকারি বেতন বাড়ানো সামাজিক বৈষম্য আরও দৃশ্যমান করবে।

তাই এখন প্রশ্ন শুধু নতুন পে-স্কেল কত হবে, যুদ্ধবিমান কতটি আসবে কিংবা বোয়িং কয়টি কেনা হবে—প্রশ্ন হলো, মানুষের হাতে কাজ ও আয় ফিরবে কবে?

একটি দেশের শক্তি শুধু তার আকাশে কত যুদ্ধবিমান উড়ছে, তা দিয়ে মাপা যায় না। কারখানা সচল কি না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আস্থার জায়গায় আছে কি না, বিদ্যুৎ-গ্যাস মিলছে কি না, ব্যবসা চাঁদাবাজিমুক্ত কি না এবং সাধারণ মানুষ মাসের শেষে সংসার চালাতে পারছে কি না—শক্তির আসল পরীক্ষা সেখানেই।

আকাশে বোয়িং উড়ুক, যুদ্ধবিমানও উড়ুক। আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে মাটিতে মানুষের জীবনটা একটু স্বস্তিতে চলুক—এই দাবিটাই বোধহয় এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬