‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৮ ।। স্বপনের স্বপ্নভঙ্গ
।। স্বপনের স্বপ্নভঙ্গ ।।

উৎসর্গ
ইউরোপের স্বপ্নে যারা ঘর ছেড়েছিল,
তাদের স্বপ্নের প্রতি—
আর যারা সেই স্বপ্নের মূল্য দিয়েছে জীবন দিয়ে।
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একের পর এক বিমান নামছে, যাত্রীরা বেরিয়ে আসছেন। কারও চোখে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, কারও হাতে নতুন জীবনের স্বপ্ন।
সেই ভিড়ের মধ্যেই নেমে এলেন ৩৮ বছরের স্বপন। হাতে আইওএমের দেওয়া নীল রঙের ব্যাগ। পরনে নেভি ব্লু ট্র্যাকস্যুট। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট। তবে সেই ক্লান্তির চেয়েও বেশি কিছু যেন জমে আছে তার চোখে—এক ধরনের ভয়, হতাশা আর ঘরে ফেরার স্বস্তি।
নয় মাস আগে যে মানুষটি বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন ইউরোপে গিয়ে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবেন। ইতালিতে থাকা ছোট ভাইয়ের মতো তিনিও একদিন ভালো আয় করবেন, পরিবারের ঋণ শোধ করবেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বেন।
কিন্তু ইতালির মাটিতে পা রাখার আগেই তার সেই স্বপ্নের মৃত্যু হয় লিবিয়ার একটি বন্দিশিবিরে।
ডেইলি ভয়েস অব পিপল, লন্ডন এর ‘বাংলাদেশ প্রতিনিধি’ বিমানবন্দরেই স্বপনের সঙ্গে দেখা করেন। লন্ডন থেকে সম্পাদকীয় নির্দেশ ছিল—শুধু বিমানবন্দরে সাক্ষাৎকার নয়, তার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে, তার মনের ভিতরের কথাগুলো তুলে আনতে হবে। ঢাকা থেকে মাদারীপুরের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের পথটুকুতে শুনতে হবে তার নয় মাসের গল্প।
বিমানবন্দর থেকে বাসে করে প্রথমে গুলিস্তান। তারপর মাদারীপুরের বাস।
বাসের জানালার পাশে বসে ছিলেন স্বপন। কিছুক্ষণ পর পর বাইরে তাকাচ্ছিলেন। বাংলাদেশের রাস্তা, মানুষ, দোকানপাট—সবকিছুই যেন তার কাছে নতুন করে দেখা।
সাংবাদিক জানতে চাইলেন, বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন?
স্বপনের জীবনে মূলত কোন অভাব ছিল না। মাদারীপুরের কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের এই মানুষটির একটি খাবারের হোটেল ছিল। রান্নায় তার হাত ছিল ভালো। পরোটা, সিঙ্গারা বানাতে পারতেন। ব্যবসাও চলছিল বেশ।
তারপরও ইতালিতে থাকা ছোট ভাইয়ের জীবন তাকে টানতে শুরু করে।
ভাই পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে। তার জীবন দেখে স্বপনের মনে হলো, ইউরোপে যেতে পারলে হয়তো নিজের ভাগ্যও বদলানো সম্ভব।
বাবা-মাসহ পরিবারের অনেকেই তাকে নিষেধ করেছিল। ইতালিতে থাকা ছোটভাই রিপনও বলেছিল, এই পথে না যেতে। স্ত্রী বিলকিস ও তিন বছরের একমাত্র আদুরে কন্যা বাবলীও বাবাকে বিদেশ যেতে বারবার নিষেধ করছিল। কিন্তু একবার মাথায় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ঢুকে গেলে যুক্তির কথা তখন আর খুব একটা শোনা যায় না।
স্বপন শুনলেন না। স্বপন তখন ইতালির রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু হয় যাত্রা। সেখানে ১২ ঘণ্টা ট্রানজিট। এরপর শ্রীলঙ্কায় দুই দিন। সেখান থেকে কুয়েতে দুই ঘণ্টার ট্রানজিট। তারপর মিসর।
মিসরে থাকতে হয় প্রায় পাঁচ মাস।

এরপর দালালদের মাধ্যমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর আল-খোমসে।
সেখানেই শুরু হয় অপেক্ষা।
যে অপেক্ষার নাম ছিল ‘গেম’।
আল-খোমসের একটি তথাকথিত গেম রুমে প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয় স্বপনকে। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিজের ইচ্ছায় কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। কখন সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে, সেটিও তার হাতে নয়।
এদিকে বাংলাদেশে পরিবারকে একের পর এক টাকা দিতে হচ্ছিল।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩২ লাখ টাকা।
টাকা দেওয়া হয়েছে কয়েক ধাপে। পরিবারের লোকজন উচ্চ সুদে ধার করেছেন। দালালের স্থানীয় প্রতিনিধির চাপ ছিল—টাকা না দিলে স্বপনকে আটকে রাখা হবে, মারধর করা হবে।
স্বপন তখনও ভাবছিলেন, ইতালিতে পৌঁছাতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
— আমার জন্য পরিবার এত টাকা ঋণ করছে। ভাবছি, ইতালি যাইতে পারলে সব শোধ কইরা দিমু। তখন বুঝি নাই, সামনে কী আছে।
প্রায় তিন মাস আগে একদিন তাকে জানানো হলো—‘গেম’ হবে।
অর্থাৎ এবার সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে।
একটি কাঠের নৌকায় উঠানো হলো ৩০ বাংলাদেশিকে। সঙ্গে ছিল চারজন মিসরীয়।
সবার চোখে তখন একটাই স্বপ্ন—ইতালি।
কেউ হয়তো পরিবারের ঋণের কথা ভাবছিলেন। কেউ ভাবছিলেন নতুন জীবনের কথা। কেউ কল্পনা করছিলেন ইউরোপের কোনো শহরে দাঁড়িয়ে একদিন বাড়িতে ফোন করার মুহূর্ত।
কিন্তু ভূমধ্যসাগরের পানিতে ঢোকার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেই স্বপ্ন থেমে যায়।
লিবিয়ার সেনাবাহিনী তাদের ধরে ফেলে।
ইতালি নয়—তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিপোলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে।
স্বপনের জন্য শুরু হয় ৪৫ দিনের আরেক জীবন।
একটি ঘর, যেখানে সর্বোচ্চ ২০০ জন থাকার কথা, সেখানে রাখা হয়েছিল প্রায় ৫০০ মানুষকে।
ঘুমানোর জায়গা নেই। স্বাভাবিকভাবে বসার জায়গা নেই। ব্যক্তিগত কোনো স্বাধীনতা নেই।
— শিউইরা উঠি ভাই। ওইখানে মানুষ ছিল মানুষ না, যেন মানুষরে গাদাগাদি কইরা রাখছে।
আর ছিল মারধর।
নাইজেরীয় কয়েকজন প্রহরীর হাতে থাকত লম্বা পাইপ।
— লম্বা লম্বা পাইপ তাদের হাতে থাকত। কথা নাই বার্তা নাই, ধুমধাম মাইরা দিত।
খাবারের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ।
সকাল প্রায় ১০টার দিকে দেওয়া হতো মোটা রুটি—যাকে তারা ‘খুবজ’ বলত। বিকেল তিনটার দিকে পাস্তা। মাঝারি আকারের একটি বাটিতে খাবার দেওয়া হতো সাতজনের জন্য। রাতেও একই খাবার।
৪৫ দিনে একবারও ভাত জোটেনি। একটু আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন স্বপন। চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সাংবাদিক ভাবলেন এ ধরনের কিছু সময় সবাইকে একা থাকতে দিতে হয়। দু‘জনই চুপচাপ।

ঢাকা থেকে মাদারীপুরগামী বাসটি তখন ফরিদপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বপন চুপ করে জানালার গ্লাসের ফাঁক দিয়ে বাইরের দৃশ্য তাকিয়ে দেখছিলেন প্রাণভরে। সাংবাদিক সাহেবও অনেক্ষণ চুপ করে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ আর চুপ থাকতে পারলেন না। ইতোমধ্যে বাস স্বপনদের বাড়ির কাছাকাছি চলে আসছিল।
সাংবাদিক আবার জানতে চাইলেন, এত অল্প খাবারে কীভাবে দিন কাটত?
স্বপন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন—
— এই খাবার না খাইয়া কোনো রাস্তা ছিল না ভাই। কারও পেটই ভরত না।
খাবারের সময়ই নাকি বন্দিশিবিরের সবচেয়ে ভারী মুহূর্ত তৈরি হতো।
— খাবারের সময় কেউ না কেউ কান্না করত। আর বাকিরা সান্ত্বনা দিত।
শুধু খাবার নয়, পানিরও কষ্ট ছিল। কলের পানি ছিল লবণাক্ত।
তবু সব কষ্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ছিল স্বাধীনতার অভাব। নিজের ঘরে ফেরার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কখন মুক্তি মিলবে, কেউ জানত না।
এরই মধ্যে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়।
২৩ আগস্ট স্বপনকে জানানো হয়, তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৩১ আগস্ট স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় ২টার দিকে বিমানে ওঠেন তিনি।
পরদিন সকালে ঢাকায় নামেন।
বিমান থেকে নামার পর তার হাতে ছিল সেই নীল ব্যাগ। কিন্তু সঙ্গে ছিল না নয় মাস আগে দেখা সেই স্বপ্ন।
ছিল ৩২ লাখ টাকার ঋণ।
ছিল পরিবারের উৎকণ্ঠা।
আর ছিল তাজুরার ৪৫ দিনের স্মৃতি।
মাদারীপুরের বাসে ওঠার পর কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলেন স্বপন। বাংলাদেশের পথ যেন তাকে ধীরে ধীরে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিচ্ছিল।
কিন্তু এই গল্প শুধু স্বপনের নয়।
তার সঙ্গে একই পথে গিয়েছিলেন মাদারীপুরের টেকেরহাটের রজইরের সোহেল মিয়াও। বয়স ৩৬। দেশে অটোরিকশা চালাতেন। সোহেল বাড়ি ছেড়েছিলেন প্রায় ১৪ মাস আগে। স্বপনের মতোই মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত, মিসর হয়ে পৌঁছেছিলেন লিবিয়ায়। ইতালি যাওয়ার আশায় তার পরিবারের খরচ হয়েছিল ৩৯ লাখ টাকা। প্রথমে ১৭ লাখ। পরে আরও ১২ লাখ। সমুদ্রযাত্রার জন্য আলাদা করে দিতে হয়েছিল আরও ১০ লাখ টাকা। পরিবারকে শেষ পর্যন্ত বাপ-দাদার জমিও বিক্রি করতে হয়েছিল।
সোহেল যে নৌকায় উঠেছিলেন, সেটি ছিল ফাইবারের। সমুদ্রে ঢোকার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে তাদেরও ধরে ফেলে লিবিয়ার বাহিনী। এরপর তাদের অন্য এক দালালের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা হয়েছিল। চাওয়া হয়েছিল আরও ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
তখন সোহেলসহ অন্যরা সৈন্যদের কাছে অনুরোধ করেন—তাদের তাজুরায় পাঠানো হোক। কারণ তারা জানতেন, সেখানে আইওএমের লোকজন যায়। হয়তো কোনোভাবে দেশে ফেরার সুযোগ মিলতে পারে। সোহেল তাজুরায় ছিলেন ৪৮ দিন। স্বপনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল তার।
প্রচণ্ড গরম, অপ্রতুল খাবার আর বন্দিত্বের সেই দিনগুলোর মধ্যে একটি দিন তার কাছে সবচেয়ে বেশি কষ্টের হয়ে আছে—ঈদুল আজহা।
সেদিনও খাবার ছিল পাস্তা।
— ওইটা কি ঈদের দিন? সারা দিন কান্না করছি আর আল্লাহরে কইছি, মাবুদ, আমারে দেশ না দেখাইয়া নিয়ো না।
বাস তখন মাদারীপুর শহর পেরিয়ে গ্রামের দিকে ঢুকছে।
জানালার বাইরে পরিচিত দৃশ্য। রাস্তার পাশে দোকান। গাছপালা। মানুষের চলাচল। দূরে গ্রামের পথ।
সাংবাদিকব বললেন, স্বপন কি আবার কখনো বিদেশে যাবার চেষ্টা করবেন?
সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে স্বপন থেমে গেলেন।
ইতালির স্বপ্নটা একেবারে মরে গেছে—এ কথা হয়তো তিনি নিজেও বলতে পারলেন না। মানুষের স্বপ্ন অদ্ভুত জিনিস। একবার মনে জায়গা করে নিলে তাকে পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন।
কিন্তু লিবিয়ার পথ তাকে একটি শিক্ষা দিয়েছে—ইউরোপের স্বপ্ন আর ইউরোপে পৌঁছানোর পথ এক জিনিস নয়।
বাস থেকে নামার সময় স্বপনের চোখে আবার পানি।
এবার সামনে তার নিজের গ্রাম।
যে ঘর থেকে নয় মাস আগে বেরিয়েছিলেন, সেই ঘরের দিকেই ফিরছেন তিনি।
পরিবার হয়তো দরজার কাছে অপেক্ষা করছে।
কিন্তু দরজায় ফিরে আসা মানুষটির হাতে নেই ইতালির কাগজ। নেই ইউরোপের নতুন জীবনের কোনো ঠিকানা।
আছে শুধু একটি নীল ব্যাগ, শরীরজুড়ে ক্লান্তি, মনে তাজুরার স্মৃতি আর কাঁধে ৩২ লাখ টাকার ঋণ।
হাঁটতে হাঁটতে স্বপন একবার পেছনে তাকালেন।
তারপর ধীরে ধীরে গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে গেলেন।
ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে মানুষটি দেশ ছেড়েছিলেন, তিনি ফিরে এলেন লিবিয়ার বন্দিশিবির পেরিয়ে।
স্বপনের গল্পের শেষ এখানেই নয়।
কারণ তার সামনে এখন আরেকটি কঠিন পথ—ঋণ শোধের পথ, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ।
আর পেছনে পড়ে রইল সেই সমুদ্রপথ, যে পথে অনেক তরুণ আজও ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়াচ্ছেন।
স্বপনের নিজের কথায় সেই পথের জন্য একটাই সতর্কতা—
— কেউ এই ভুল করবেন না। এই পথে যাইয়েন না। দূর থেইকা ইতালি যত সুন্দর লাগে, কাছে গিয়া বুঝবেন পথটা কেমন।
লন্ডন
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬