বাংলাদেশ সংবাদ
দেশের বাজারে ভেজাল-নকল পণ্য, ভোক্তার সতর্কতাই প্রথম প্রতিরোধ
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২ সেপ্টেম্বর:
দেশের বাজারে মানহীন, ভেজাল, নকল ও অনুমোদনহীন পণ্যের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নিয়মিত অভিযান ও পরীক্ষার পরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি। সম্প্রতি পরীক্ষাগারে নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় মসলা, ঘিসহ কয়েকটি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। একই সঙ্গে এসব পণ্য না কিনতে ভোক্তাদের সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এর আগেও গত জুলাইয়ে মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় চার প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ও প্রসাধনীসহ আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা আবারও সামনে এনেছে বাজারে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রত্যাহারের নির্দেশ বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে—সে প্রশ্ন।
বিএসটিআই নিয়মিত বাজার থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে নিজস্ব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে। মান না থাকলে পণ্য প্রত্যাহার, কারণ দর্শানোর নোটিশসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ, লাইসেন্সবিহীন ও অনুমোদনহীন পণ্যের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তবে দেশের হাজার হাজার বাজার, দোকান ও গুদামে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি পণ্যের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালানো সহজ নয়। বিএসটিআইয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টিতে সংস্থাটির কার্যালয় রয়েছে। ফলে জনবল ও তদারকি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
পণ্য কেনার আগে কী দেখবেন
ভোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো পণ্যের মোড়ক। প্যাকেটজাত খাদ্যে সাধারণত পণ্যের নাম, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা, ওজন বা পরিমাণ, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং উপাদানের তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক।
এসব তথ্য অনুপস্থিত, অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক হলে পণ্যটি কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্যাকেটের অবস্থাও দেখতে হবে। খাদ্যপণ্যের মোড়ক ঢিলেঢালা বা ঠিকভাবে বায়ুরোধী না হলে ভেতরে আর্দ্রতা ঢুকে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হতে পারে।
পণ্যের সত্যতা যাচাইয়ে কিউআর কোডও কাজে লাগতে পারে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত পণ্যের ক্ষেত্রে স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকে। নকল পণ্যে সেই তথ্য না-ও পাওয়া যেতে পারে।
অনুমোদনের পরও মান নষ্ট হলে ব্যবস্থা
কোনো প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স পাওয়ার পরও যদি নির্ধারিত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংস্থাটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। প্রতিষ্ঠান মান সংশোধন করে পুনরায় পরীক্ষার আবেদন করতে পারে। নতুন পরীক্ষায় পণ্য নির্ধারিত মান পূরণ করলে আবার বাজারজাতের সুযোগও রয়েছে।
সমস্যা দেখা দেয় প্রত্যাহারের নির্দেশের পর। কোনো দোকানে নিষিদ্ধ বা প্রত্যাহার করা পণ্য পাওয়া গেলে দোকান মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনুমোদনহীন বা লাইসেন্সবিহীন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারখানা সিলগালা, জরিমানা ও মামলা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
পুরোনো সমস্যা, নতুন সতর্কতা
মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে বিএসটিআইয়ের ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০১৯ সালে প্রথম দফায় পরীক্ষা করা ৩১৩টি পণ্যের মধ্যে ৫২টি নিম্নমানের পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে আরও ৯৩টি পণ্য পরীক্ষা করে ২২টির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ওই বছর সব মিলিয়ে ৭০টির বেশি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ পেয়েছিল। ২০২০ সালেও ৪৩টি পণ্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বিএসটিআইয়ের পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও বাজারে মানহীন ও অনিরাপদ পণ্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তারপরও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি অভিযান দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা কঠিন। উৎপাদক ও বিক্রেতার দায়বদ্ধতার পাশাপাশি ভোক্তার সচেতনতাও জরুরি।
তাই পণ্য কেনার সময় শুধু পরিচিত ব্র্যান্ড বা কম দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়। পণ্যের মোড়ক, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ, উপাদান, ওজন, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন এবং কিউআর কোড—সবকিছু যাচাই করেই কেনাকাটা করা উচিত। কারণ বাজারে ভেজাল পণ্য ঠেকানোর প্রথম দেয়াল অনেক সময় সরকারি অভিযান নয়, সচেতন ভোক্তাই।