বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে ১১ বছর পর সরকারি বেতন বাড়ল, বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২ সেপ্টেম্বর:
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
তবে বেতন বাড়ার এই সুখবরের আড়ালেই সরকারের সামনে তৈরি হয়েছে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বছরে বাড়বে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে?
বাজেট ঘাটতির মধ্যেই নতুন চাপ
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নতুন পে-স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে, তা বর্তমান বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৩ শতাংশের সমান।
অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত।
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি দায় রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত সরকারি ব্যয় আরও বাড়লে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের দিকে যেতে হতে পারে। আর নিয়মিত বেতন-ভাতা মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে ভবিষ্যৎ বাজেটে সুদ ও ঋণ পরিশোধের দায়ও বাড়বে।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
সরকার অবশ্য একসঙ্গে পুরো পে-স্কেল কার্যকর করছে না। নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী ধাপে এর পূর্ণ সুবিধা দেওয়া হবে। বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে এক অর্থবছরে সরকারের ওপর পুরো আর্থিক চাপ পড়বে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিষয়টি ভিন্ন। বেতন ও ভাতা বাড়ার পর এটি স্থায়ী সরকারি ব্যয়ে পরিণত হবে। এর সঙ্গে প্রতিবছরের ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, অবসর সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ও বাড়বে।
তাই পে-স্কেলের অর্থসংস্থানকে শুধু চলতি বছরের বাজেটের হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। আগামী কয়েক বছরের রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজস্ব বাড়ানোই বড় পরীক্ষা
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সরকারের নিজস্ব আয় বাড়ানো। কর আদায়ের পরিমাণ না বাড়িয়ে শুধু ঋণ করে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারের সামনে তখন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানো, অন্যান্য সরকারি ব্যয় সংকুচিত করা অথবা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ বাড়ানোর মতো বিকল্প থাকবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, পে-স্কেলের কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে না।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হবে। এই বাড়তি ব্যয় রাজস্ব ও ঋণ—দুই উৎস থেকেই মেটাতে হতে পারে, যার প্রভাব বাজারে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেতন বাড়লেই কমবে কি দুর্নীতি?
নতুন পে-স্কেলের পক্ষে সরকারের অন্যতম যুক্তি হলো, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কমলে তাঁদের জীবনযাত্রার মান বাড়বে এবং দুর্নীতির প্রবণতা কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও দুর্নীতি কমানোর একমাত্র উপায় এটি নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা আশা করা কঠিন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি বন্ধ হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
তাঁর মতে, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারণ দুর্নীতির সঙ্গে শুধু বেতন নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও জড়িত।
নিম্ন গ্রেডে সবচেয়ে বেশি সুবিধা
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধি।
২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১৪২ শতাংশ। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, যা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই শ্রেণির বেতন বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি বন্ধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি
সরকারি কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে বাজারে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে বাড়তি চাহিদা পণ্যের দাম বৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এ কারণে নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে বাড়তি আয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষও মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে পড়তে পারেন।
চারটি বড় পরীক্ষার সামনে সরকার
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর সরকারের সামনে চারটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বেতন বাড়ার ফলে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলে যাতে পণ্যের দাম না বাড়ে, সে জন্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত স্থায়ী ব্যয় সামলাতে কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যৎ বাজেটে ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে।
তৃতীয়ত, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাত সম্প্রসারিত না হলে বাড়তি অর্থের একটি অংশ মূল্যস্ফীতিতে চলে যেতে পারে।
চতুর্থত, দুর্নীতি ও অপচয় কমানো। বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি সেবার মান, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহি না বাড়লে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
প্রায় ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। কিন্তু সরকারের জন্য এটি একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের সূচনা।
এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে সরকার কীভাবে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগাড় করে, রাজস্ব আয় কতটা বাড়াতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তার ওপর।
কারণ বেতন বাড়ানো একবারের সিদ্ধান্ত হলেও এর ব্যয় বহন করতে হবে প্রতি বছর। সেই ব্যয়ের ভার যদি উৎপাদন ও রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে সামলানো না যায়, তাহলে আজকের বেতন বৃদ্ধির দায় আগামী দিনের বাজেটেই ফিরে আসবে।