“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬০।। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বিশেষ কলাম।। বাংলাদেশের পর্যটন: সৌন্দর্য আছে, এবার চাই সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬০।। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বিশেষ কলাম।।  বাংলাদেশের পর্যটন: সৌন্দর্য আছে, এবার চাই সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা

।। বাংলাদেশের পর্যটন: সৌন্দর্য আছে, এবার চাই সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা।।

উৎসর্গ :

বাংলাদেশের নদী, পাহাড়, সমুদ্র ও অরণ্যের সৌন্দর্যকে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে যারা স্বপ্ন দেখেন—তাদের।

বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে একটি বাক্য শুনে আসছি—‘বাংলাদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।’

সমুদ্র আছে, পাহাড় আছে, নদী আছে, হাওর আছে, চা-বাগান আছে, সুন্দরবন আছে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে। আছে লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের আতিথেয়তা।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এত কিছু থাকার পরও বাংলাদেশ পর্যটনে পিছিয়ে কেন?

২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এবারের আলোচনায় ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তি পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। অথচ বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আগমনের ধারায় এখনও কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যাচ্ছে না।

সমস্যা তাই প্রকৃতির নয়। সমস্যা পর্যটন ব্যবস্থাপনায়।

আমার প্রস্তাব খুব সরল—আর শুধু ‘সম্ভাবনা’ নিয়ে কথা নয়; এবার প্রতিটি কাজের দায়িত্ব, সময়সীমা ও ফলাফল নির্ধারণ করতে হবে।

প্রথমত: প্রতিটি বড় পর্যটনকেন্দ্রের জন্য একজন একক দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দরকার। কক্সবাজারে পর্যটন বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বহু প্রতিষ্ঠান কাজ করে। কিন্তু পর্যটকের কাছে এগুলো আলাদা প্রতিষ্ঠান নয়—তিনি দেখেন একটি বাংলাদেশ।

তাই কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটের প্রধান পর্যটন অঞ্চল, পার্বত্য এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের জন্য একজন চিফ ট্যুরিজম ম্যানেজার বা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ করা যেতে পারে।

সময়: ৬ মাস।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। সুন্দরবন, পাহাড় ও পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকায় কতজন পর্যটক দিনে প্রবেশ করতে পারবেন, কতক্ষণ থাকতে পারবেন—তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রয়োজনে অনলাইন টিকিট ও সময়ভিত্তিক প্রবেশব্যবস্থা চালু করতে হবে।

সময়: ১২ মাসে ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, ১৮ মাসে অনলাইন স্লটভিত্তিক ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, পর্যটন খাতে কত টাকা খরচ হলো—এই হিসাবের পাশাপাশি কী ফল হলো, সেটিও জানাতে হবে।

কত বিদেশি পর্যটক এলেন, কোন দেশ থেকে এলেন, কতদিন থাকলেন, কত টাকা ব্যয় করলেন, কোথায় গেলেন, কী অভিযোগ করলেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

২০২৭ সাল থেকে প্রতি বছর জাতীয় পর্যটন রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করা যেতে পারে।

চতুর্থত, একটি কার্যকর বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যাপ দরকার। শুধু ছবি ও বর্ণনা নয়—আবহাওয়া, রাস্তার অবস্থা, বাস-ট্রেন-ফ্লাইট, হোটেল, অনুমোদিত গাইড, প্রবেশমূল্য, অনলাইন টিকিট, চিকিৎসা, পুলিশ সহায়তা ও অভিযোগ—সব এক জায়গায় থাকতে হবে।

এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করা যেতে পারে। একজন পর্যটক তাঁর বাজেট ও সময় জানালে অ্যাপ তাঁকে সম্ভাব্য গন্তব্য, যাতায়াত, থাকা, খাবার ও দর্শনীয় স্থান মিলিয়ে পরিকল্পনা দিতে পারে।

সময়: ৬ মাসে নকশা, ১২ মাসে প্রাথমিক সংস্করণ, ১৮ মাসে পূর্ণাঙ্গ সেবা।

পঞ্চমত, বিদেশি পর্যটকের জন্য দরকার ‘এক জানালা’ ব্যবস্থা। ভিসা, হোটেল, পরিবহন, গাইড ও ভ্রমণপথের তথ্য এক জায়গায় না থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন।

১২ মাসের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পর্যটন পোর্টাল চালু করা যেতে পারে।

ষষ্ঠত, সব জায়গায় একসঙ্গে কাজ করার বদলে কক্সবাজারকে পাইলট আন্তর্জাতিক পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটন পরিবহন, পার্কিং, পরিচ্ছন্ন সৈকত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বহুভাষিক সাইনবোর্ড, নিরাপত্তা ও পর্যটক সহায়তা—সবকিছুর সমন্বিত মডেল তৈরি হোক।

৩ মাসে পরিকল্পনা, ২৪ মাসে প্রথম ধাপ এবং ৩৬ মাসে পূর্ণাঙ্গ মডেল।

সফল হলে সেই মডেল সিলেট, সুন্দরবন, পার্বত্য এলাকা ও অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে প্রয়োগ করা যাবে।

সপ্তমত, পর্যটকের কাছে মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বন্ধ করতে হবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও গাইডের অনুমোদিত মূল্যতালিকা দৃশ্যমান ও অনলাইনে থাকতে হবে। অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও দরকার।

৬ মাসে প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে মূল্যতালিকা এবং ১২ মাসে ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা।

অষ্টমত, স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অর্থনীতির অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় তরুণদের ভাষা, গাইডিং, আতিথেয়তা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যটক নিরাপত্তায় প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

৬ মাসে প্রশিক্ষণ কাঠামো, ১২ মাসে অন্তত ১০টি বড় পর্যটন এলাকায় কার্যক্রম শুরু এবং ৩ বছরে সম্প্রসারণ।

নবমত, বিদেশি পর্যটক আনার পরিকল্পনা হতে হবে দেশভিত্তিক। কোন দেশের পর্যটক বাংলাদেশের প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি বা পারিবারিক ভ্রমণে আগ্রহী—তা বিশ্লেষণ করে আলাদা বাজার কৌশল তৈরি করতে হবে।

৬ মাসে অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার বাজার নির্ধারণ এবং ১২ মাসে আলাদা বিপণন পরিকল্পনা।

বাংলাদেশকে শুধু ‘সুন্দর দেশ’ বলে প্রচার করলে হবে না। একজন ব্রিটিশ, জার্মান, জাপানি বা ভারতীয় পর্যটক বাংলাদেশে এসে কী দেখলেন, কী খেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন—সেই অভিজ্ঞতার গল্প আন্তর্জাতিক প্রচারণার কেন্দ্রে আনতে হবে।

৯ মাসে নতুন প্রচারণা কৌশল এবং ১২ মাসে বহুভাষিক প্রচারণা শুরু করা যেতে পারে।

দশমত, পর্যটকের খরচ যেন স্থানীয় অর্থনীতিতে পৌঁছায়। স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, নৌকা, গাইড, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ অভিজ্ঞতাকে পর্যটন প্যাকেজে যুক্ত করা হোক।

১২ মাসে অন্তত ১০টি বড় পর্যটন এলাকায় পাইলট প্রকল্প এবং ৩ বছরে সম্প্রসারণ।

আর পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন একটি ২৪ ঘণ্টার পর্যটক সহায়তা নম্বর। চিকিৎসা, পুলিশ, পাসপোর্ট হারানো, প্রতারণা, পরিবহন সমস্যা কিংবা ভাষাগত সহায়তা—সবকিছুর জন্য একটি নম্বর।

৬ মাসে পাইলট, ১২ মাসে প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে এবং ১৮ মাসে জাতীয় পর্যায়ে চালু করা যেতে পারে।

সবশেষে প্রতিটি বড় পর্যটনকেন্দ্রের জন্য বছরে একবার রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করতে হবে—পর্যটক সংখ্যা, বিদেশি পর্যটক, গড় ব্যয়, অবস্থানকাল, অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশের ক্ষতি, স্থানীয় আয় ও পর্যটকের সন্তুষ্টি।

১২ মাসে সূচক নির্ধারণ এবং ১৮ মাসে প্রথম রিপোর্ট।

তাহলে বোঝা যাবে, কোন পর্যটনকেন্দ্র সত্যিই উন্নতি করছে আর কোনটি শুধু কাগজে।

এবার দরকার সময়ের হিসাব

বাংলাদেশের পর্যটনে পরিকল্পনার অভাব নেই। অভাব হচ্ছে পরিকল্পনাকে সময় ও জবাবদিহির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া।

ছয় মাসে কী হবে, এক বছরে কী হবে, ১৮ মাসে কী হবে, তিন বছরে কোথায় পৌঁছাতে হবে—সেটি জনগণকে জানাতে হবে। কে করবেন, সেটিও বলতে হবে।

কারণ সময়সীমা ছাড়া পরিকল্পনা ইচ্ছা, দায়িত্ব ছাড়া সময়সীমা ঘোষণা, আর ফলাফল ছাড়া বাস্তবায়ন কাগজের সাফল্য।

বাংলাদেশের সমুদ্র আছে—এখন সমুদ্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা চাই। পাহাড় আছে—পাহাড়কেন্দ্রিক পরিকল্পনা চাই। সুন্দরবন আছে—পরিবেশ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবস্থাপনা চাই।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই প্রশ্নটি আর হওয়া উচিত নয়—বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা কত বড়?

প্রশ্ন হওয়া উচিত—আগামী এক বছরে কী পরিবর্তন হবে, তিন বছরে কোথায় পৌঁছাব, আর কাজ না হলে দায় নেবে কে?

প্রকৃতি বাংলাদেশকে পর্যটনের পুঁজি দিয়েছে বহু আগেই।

এবার প্রয়োজন সেই পুঁজির সঠিক ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দৃশ্যমান ফলাফল।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,  ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬