ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশে তেলের সংকটে ৫৩ বিদ্যুৎকেন্দ্র, উৎপাদন নেমেছে এক-চতুর্থাংশে
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৫ আগস্ট:
তেলের মজুত সংকটে দেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। ৫৩টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট হলেও মঙ্গলবার দুপুরে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৯৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ তেলভিত্তিক কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের মজুত নেমে এসেছে ৭-৮ দিনের নিচে। স্বাভাবিক সময়ে এসব কেন্দ্রে অন্তত ১৫ দিনের জ্বালানি মজুত থাকার কথা। তেলের সংকটের কারণে এখন শুধু সন্ধ্যার পিক আওয়ারে সীমিত আকারে কয়েকটি কেন্দ্র চালু রাখা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন আগে থেকেই চাপের মধ্যে ছিল। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
৩৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং
পিডিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। তারপরও কোনো কোনো সময়ে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুর ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াট।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) পাওনা দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ না হওয়ায় তারা নতুন করে তেল কিনতে পারছে না। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে পিডিবির বকেয়া রয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিল না পেয়ে তেল কিনতে পারছে না আইপিপি
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৬-৭ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। টাকা না পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তেল কিনবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সরকার প্রতিবছর বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়। এর মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অংশ প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা।
অনেক কেন্দ্রে কয়েক ঘণ্টার তেলও নেই
তেলভিত্তিক ৫১টি কেন্দ্রের ৩০ জুলাই পর্যন্ত জ্বালানি মজুত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে একদিনেরও কম তেল রয়েছে।
পিডিবির তিতাস ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে তেলের মজুত মাত্র ১২৬ টন, যা দিয়ে একদিনও কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে পিডিবির ভেড়া ৭০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি মজুত রয়েছে—১ হাজার ১১৮ টন, যা দিয়ে প্রায় ১২ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
বেসরকারি ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৪৩টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৭৪১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্রে একেবারেই তেল নেই।
যেমন:
- গাজীপুর ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্রে কোনো তেল মজুত নেই।
- দেশ এনার্জির চাঁদপুর ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রেও তেল নেই, ফলে উৎপাদন বন্ধ।
- ওরিয়নের খুলনা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।
- ওরিয়নের মেঘনাঘাট কেন্দ্রে মাত্র ৩২ টন ফার্নেস অয়েল রয়েছে, যা কয়েক ঘণ্টার বেশি চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
- ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র ৩৯ টন তেল, যা দিয়ে ১-২ ঘণ্টা চলবে।
মজুত আছে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তেল মজুত ছিল ইপিভি ঠাকুরগাঁও ১১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে। সেখানে ৫ হাজার ১৬২ টন তেল রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৮ দিন কেন্দ্র চালানো সম্ভব।
এছাড়া বারাকা শিকলবাহা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৪ হাজার ৪৪১ টন তেল রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৭ দিন উৎপাদন চালানো যাবে। বারাকা পতেঙ্গা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রেও প্রায় ১৫ দিনের মজুত রয়েছে।
তবে ৫৩টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মধ্যে ১০ দিনের বেশি তেল মজুত আছে মাত্র ১০টিতে। পাঁচটি কেন্দ্র পুরোপুরি তেলশূন্য এবং ১০টি কেন্দ্রে একদিনের কম উৎপাদনের মতো জ্বালানি রয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট, তেল সংকট এবং বকেয়া বিল—এই তিনটি কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে।
বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমলেও উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ফলে জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।