কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৩ ।। এবারের নির্বাচন আওয়ামী লীগবিহীন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন
উৎসর্গ
সারা দেশব্যাপী যেসব নিরীহ শিক্ষক ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের কাজে সম্পৃক্ত থাকবেন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নির্বাচন আসে, যেগুলো কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়—রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানসিকতা, ক্ষমতার প্রকৃতি এবং ভোটারের মনস্তত্ত্বকে নতুন করে উন্মোচন করে। ২০২৬ সালের ত্রয়দশ সংসদ নির্বাচন সেই বিরল মুহূর্তগুলোর একটি।
কাগজে-কলমে এটি এমন একটি নির্বাচন, যেখানে আওয়ামী লীগ নেই—নিবন্ধন স্থগিত, প্রতীক নেই, প্রার্থী নেই, প্রচার নেই।
কিন্তু বাস্তবে এই নির্বাচন এমনভাবে আওয়ামী লীগকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে যে, দলটি অনুপস্থিত থেকেও সবচেয়ে উপস্থিত শক্তি।
এটাই এই নির্বাচনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—
আওয়ামী লীগ নেই, কিন্তু আওয়ামী লীগই সবকিছু নির্ধারণ করছে।

কারণ রাজনৈতিক দলকে ব্যালট থেকে সরানো যায়, কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি থেকে সরানো যায় না। যদিও আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের অনেক ভুলত্রুটি আছে। কিন্তু লাখ লাখ নিরীহ সাধারণ আওয়ামী সমর্থকদের তো এর দায় নেবার কথা নয়। এরা এখন যে দলকে ভোট দেবে তারাই কামিয়াব হবার সম্ভাবনা।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ যে বিশাল সামাজিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে—ইউপি সদস্য থেকে এমপি, স্থানীয় নেতা থেকে সুবিধাভোগী পরিবার—এই কাঠামো কোনো কাগুজে সংগঠন নয়, এটি একটি জীবন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের জরিপে দেখা যাচ্ছে—দল নির্বাচনে না থাকলেও প্রায় ১৯ শতাংশ মানুষ এখনো আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান।
এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক পরিচয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মুছে যায় না।
এই কারণেই এই নির্বাচনের মূল প্রশ্ন বিএনপি কত আসন পাবে, জামায়াত কোথায় দাঁড়াবে, এনসিপি কতটা বিস্তার ঘটাবে—এসব নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো—
আওয়ামী লীগের ভোট কোথায় যাবে?
এই একটি প্রশ্নই পুরো নির্বাচনের ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ৪৫–৫৫ শতাংশ বিএনপির দিকে, ১৫–২০ শতাংশ জামায়াত বা ধর্মভিত্তিক দলের দিকে, আরেকটি অংশ স্থানীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে যেতে পারে।
অন্তত ১০–২০ শতাংশ ভোটার ভোটেই না যেতে পারেন।
অর্থাৎ এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর শক্তি দিয়ে নয়—আওয়ামী লীগের ভোটের গতিপথ দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি আজ একই কৌশলে একমত:
আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে যেতে হবে।
বিএনপি প্রকাশ্যে বলছে—আওয়ামী লীগের ‘নির্দোষ’ কর্মীদের ক্ষতি করা হবে না।
জামায়াত বলছে—আওয়ামী লীগ থেকে এলে সব দায়-দায়িত্ব নেবে।
এনসিপি বলছে—আওয়ামী লীগের যেসব অনুসারী অপরাধে যুক্ত নন, তাদের নিয়ে কাজ করতে চায়।
তিনটি ভিন্ন মতাদর্শ, তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ইতিহাস—কিন্তু লক্ষ্য একটাই:
আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশ নিজেদের ঘরে তোলা।
এটাই প্রমাণ করে—আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থেকেও নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি।
স্থানীয় বাস্তবতা আরও স্পষ্ট।
হবিগঞ্জ-৪ এর মতো আসনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন—৩০–৪০ শতাংশ ভোটার ভোটে না-ও যেতে পারেন।
বাকি ভোট বিএনপি, স্বতন্ত্র বা অন্যদের মধ্যে ভাগ হবে।
অর্থাৎ পুরো সমীকরণই নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ভোটের ওপর।
গ্রামীণ রাজনীতিতে ব্যানার-পোস্টারের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি কার্যকর।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি না করলেও নীরবে ভোটের গতিপথ নির্ধারণ করছেন।
এই নীরব নেটওয়ার্কই বহু আসনের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
সহিংসতার পরিসংখ্যানও দেখায়—রাজনীতির কেন্দ্রে এখনও আওয়ামী লীগই।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের বড় অংশই আওয়ামী লীগ-বিএনপি, আওয়ামী লীগ-জামায়াত বা আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে।
অর্থাৎ সংঘাতের কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একই চিত্র।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদন, আল জাজিরার সাক্ষাৎকার—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্র আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, সহিংসতা, নিহতের সংখ্যা।
দলটি নির্বাচনে না থাকলেও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়নি।
সব মিলিয়ে আমরা এমন একটি নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ব্যালটে নৌকা নেই, কিন্তু ব্যালটের প্রতিটি হিসাব নৌকাকে ঘিরেই করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক শক্তি এখানে প্রতীকে নয়—মানুষের মানসিক অবস্থানে।
এই কারণেই বলা যায়—এটি কেবল আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন নয়।
এটি আওয়ামী লীগকে ঘিরে হওয়া নির্বাচন।
নৌকা নেই, কিন্তু নৌকার ঢেউ আছে।
আর সেই ঢেউ কোন দিকে যাবে—সেটাই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র।
এই অর্থেই যথার্থভাবে বলা যায়—
এবারের নির্বাচন আওয়ামী লীগবিহীন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬