ব্রিটেন সংবাদ
কোটিপতিদেরও রাষ্ট্রীয় পেনশন কেন? ব্রিটেনে বাড়ছে বিতর্ক
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৬ সেপ্টেম্বর:
ব্রিটেনে রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—যেসব অবসরপ্রাপ্ত মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ ও আয় এত বেশি যে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজন নেই, তাদেরও কি একইভাবে State Pension দেওয়া উচিত?
বর্তমান ব্যবস্থায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে যোগ্যতা অর্জনকারী ব্যক্তিরা State Pension পাওয়ার অধিকার রাখেন। অর্থাৎ কারও বিপুল সম্পদ, বড় বাড়ি, ব্যক্তিগত পেনশন কিংবা বিনিয়োগ থেকে বড় অঙ্কের আয় থাকলেও শুধু সম্পদের কারণে তার State Pension বন্ধ হয় না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পূর্ণ নতুন State Pension সপ্তাহে £241.30, অর্থাৎ বছরে প্রায় £12,548।
এই সার্বজনীন ব্যবস্থার সমালোচকেরা বলছেন, রাষ্ট্র যখন সীমিত অর্থে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক পরিচর্যা ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন অত্যন্ত ধনী অবসরপ্রাপ্তদের একই হারে রাষ্ট্রীয় পেনশন দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
তবে বিষয়টি কেবল ‘ধনীদের পেনশন বন্ধ’ করার মতো সরল নয়। State Pension মূলত National Insurance অবদানের সঙ্গে যুক্ত একটি অধিকার। ফলে কর্মজীবনে দীর্ঘ সময় National Insurance পরিশোধ করা ব্যক্তির কাছে অবসরকালে পেনশন পাওয়া একটি অর্জিত অধিকার হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ব্যয়ের চাপ বাড়ছে
ব্রিটেনের জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের অনুপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে State Pension-এর ওপর সরকারের ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে বাড়ছে। একই সঙ্গে Triple Lock-এর কারণে পেনশন সাধারণত মূল্যস্ফীতি, গড় মজুরি বৃদ্ধি অথবা ২.৫ শতাংশ—এই তিনটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে বাড়ে।
এ ব্যবস্থার ফলে পেনশন ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদ ও পেনশন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, Triple Lock ইতোমধ্যে বছরে প্রায় £12 বিলিয়ন অতিরিক্ত পেনশন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে দরিদ্র অবসরপ্রাপ্তদের জন্য রয়েছে Pension Credit। ২০২৬ সালের এপ্রিলে Pension Credit-এর Standard Minimum Guarantee একক ব্যক্তির জন্য সপ্তাহে £238 এবং দম্পতির জন্য £363.25 হয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে নিম্নআয়ের প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
তাহলে কি ধনীদের পেনশন কমানো হবে?
এ মুহূর্তে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেই। বরং সরকার আগে সংসদে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, State Pension-এর জন্য means test চালুর পরিকল্পনা নেই এবং Triple Lock বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
তবে ২০২৬ সালে পেনশন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন কিছু প্রস্তাব সামনে এসেছে। Tony Blair Institute-এর একটি প্রস্তাবে প্রচলিত State Pension কাঠামোর বদলে আরও নমনীয় ‘Lifespan Fund’ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে কর্মজীবন ও অবসর—দুই পর্যায়েই রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর ধারণা রয়েছে।
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক প্রস্তাব করছেন, State Pension পুরোপুরি তুলে না দিয়ে উচ্চ সম্পদ বা উচ্চ অবসরকালীন আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানো যেতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের অবসরপ্রাপ্তদের সুরক্ষা বজায় রেখে সরকারের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বড় প্রশ্ন প্রজন্মের ন্যায্যতা
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—আজকের কর্মজীবীরা যে হারে কর ও National Insurance দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে তারা একই ধরনের পেনশন সুবিধা পাবেন কি না।
একদিকে ধনী অবসরপ্রাপ্তদের রাষ্ট্রীয় পেনশন কমানোর যুক্তি হলো, সীমিত সরকারি অর্থ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের পেছনে ব্যয় করা উচিত। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করেন, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তিই হলো—এটি সম্পদের ওপর নির্ভর করে বৈষম্য তৈরি করে না এবং কর্মজীবনে অবদান রাখা প্রত্যেককে অবসরে একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা দেয়।
ফলে ব্রিটেনে বিতর্কটি এখন আর শুধু ‘কোটিপতিরা পেনশন পাবেন কি না’—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্ন হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রীয় পেনশন কি সবার অর্জিত অধিকার থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সম্পদ ও আয়ের ভিত্তিতে এর সুবিধা পুনর্বিন্যাস করা হবে?
সরকার এখনো সার্বজনীন State Pension ব্যবস্থার পক্ষেই রয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান পেনশন ব্যয় এবং সরকারি অর্থের ওপর চাপ—এই তিন বাস্তবতা ভবিষ্যতে বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আরও জোরালোভাবে নিয়ে আসতে পারে।