‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪০ ।। সখিপুরের সখির মন
।। সখিপুরের সখির মন ।।
উৎসর্গ
সন্তানের ভালোবাসাকে সম্মান করেন,
তবু তার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য
সতর্ক থাকতে জানেন—
সেই সব অভিভাবকদের প্রতি।

সখীর বয়স পঁচিশ। খুব বেশি স্বপ্নবিলাসী মেয়ে সে নয়। সংসারের কাজ করে, বাড়ির মানুষকে দেখে, অবসরে মোবাইল টিপে। সেই মোবাইলই একদিন তার জীবনে এমন একজন মানুষকে এনে দিল, যাকে সে আগে কখনো চোখে দেখেনি, যার ভাষা আলাদা, দেশ আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা।
চীনের যুবক দং লিয়াংয়ের সঙ্গে একটি অ্যাপে পরিচয়। প্রথমে দু-একটা কথা। তারপর নিয়মিত কথা বলা। কখনো মেসেজ, কখনো ভিডিও কল। তিন মাসের মধ্যেই কথাবার্তা এমন জায়গায় পৌঁছাল যে সখির মনে হলো, মানুষটা যেন অনেক দিনের পরিচিত।
দং লিয়াংও একদিন বলল, সে বাংলাদেশে আসবে। সখিকে বিয়ে করবে। প্রয়োজনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে।
কথাটা শুনে সখির বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠেছিল।

টাঙ্গাইলের সখীপুরের গ্রাম। চারপাশে সবুজ, পুকুর, ধানখেত, বাঁশঝাড় আর মাটির পথ। এখানকার মানুষের জীবন এখনও অনেকটাই পরিচিত গণ্ডির মধ্যে। কার বাড়িতে নতুন গরু এসেছে, কার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, কে বিদেশ থেকে ফিরেছে—এসব খবর মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে চীনের এক যুবক সখীকে বিয়ে করতে এসেছে—এ খবর ছড়িয়ে পড়তে কতক্ষণ!
চায়ের দোকানে বসে কেউ বলল, “মাইয়া তো দেখি ভাগ্যবতী!”
কেউ আবার বলল, “ভাগ্যবতী না বিপদবতী, আগে দেখা দরকার!”
সখির ভাবী হেলন অবশ্য প্রথম থেকেই বিষয়টাকে একটু অন্য চোখে দেখছিল। এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর সখিকে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১০ বছরের বালিকা। আর হেলন তখন মাত্র পনেরো বছরের কিশোরী বধু। বিয়ের কিছুদিন পর হেলেনের শ্বাশুড়ি মারা যান। কাছাকাছি বয়সের হওয়ায় ননদ সখির সাথে ভাবী হেলনের একটা প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এরই মধ্যে দুই সন্তানের জননী হয়েছেন হেলন। শ্বাশুড়ির মৃত্যুর পর থেকেই ভাবী সখিকে বুকের মাঝে মায়ের স্নেহে ধরে রেখেছেন। এক বিকেলে সখিকে পাশে বসিয়ে ভাবী বলল—
—কী রে, চীনা জামাই কবে নিয়া আসবি?
সখি লজ্জা পেয়ে বলল—
—ভাবী, তুমি না!
হেলন হেসে উঠল। হেসে বাংলা সিনেমার গান গেয়ে উঠলো-‘শোন্ লো সখি শোন, আমার কথা শোন, চীন দেশের ঐ সুজন তোর কেড়ে নিল মন..’
—ভাবী, তোমার দেখি খুশিতে পেট ভরে গেছে? গান থামাও। আমার মনের অবস্থাটা বুঝার চেষ্টা করো। ভাবী সাথে সাথেই গান থামিয়ে বললো,
—তুই কি নিজেকে নায়িকা কবরীর মতো সখী আর ওই চীনা বেডাকে নায়ক ফারুক ভাবছিস? মানে খান আতার ‘সুজনসখী’র সিনেমার মতো হতে চাস?
সখীও হেসে ফেলল। তারপর একটু চুপ করে বলল—
—ভাবী, সব সময় মজা করো না। ঐ চীনা লোকটি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে।
হেলনের হাসি এবার একটু থেমে গেল।
—ভালোবাসে, সেটা কে জানে? তুই ওরে কত দিন ধরে চিনিস?
—তিন মাস।
—তিন মাসে মানুষ চেনা যায়?
সখী কোনো উত্তর দিল না।
হেলন আবার বলল—
—মোবাইলে মানুষরে যত সহজ লাগে, সামনে মানুষটা তত সহজ নাও হতে পারে। তোর সঙ্গে ও কীভাবে কথা বলে? তুই কি চীনা চ্যাং ম্যাং ভাষা বুঝিস?
সখী একটু ইতস্তত করে বলল—
—আমি বুঝি ভাবী। এখন বাংলা ভাষাকে অনুবাদ করে বুঝা যায়। তুমি ওসব বুঝবা না। ও বলেছে বিয়ে করবে। বাংলাদেশে এসে আমাকে বিয়ে করতে চায়। ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করবে বলছে।
—তোরে বিদেশে নিয়া যাবে?
—বলছে, পরে নিয়ে যাবে।
হেলন এবার সখীর চোখের দিকে তাকাল।
—এই “পরে” কথাটাই বেশি ভয় লাগে। তোরে এত দূরে নিয়ে গেলে আমি তোকে দেখবো কেমনে?
সখী বিরক্ত হয়ে বলল—
—তাই বইলা তুমি আমারে বিয়া দিবা না? তুমি সবকিছুতেই ভয় দেখাও কেন?
—কারণ তুই আমার আপন মানুষ। তোর ভালো হলে আমি খুশি হব, আর তোর ক্ষতি হলে আমারও ঘুম থাকবে না। তোকে কাছাকাছি কোথাও বিয়ে দিতে চাইছিলাম। তোরে না দেখলে আমি কিভাবে থাকবো তুই বল্?
ভাবীর সাথে এই খুনসুটির ঠিক একদিন পরই চীন থেকে দং লিয়াং সত্যিই সখির বাড়িতে এসে হাজির। বিদেশি মানুষকে সামনে থেকে দেখে গ্রামের মানুষের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। কেউ দূর থেকে তাকায়, কেউ কাছে এসে কথা বলার চেষ্টা করে। কেউ আবার মোবাইল বের করে ছবি তুলতে চায়।
দং লিয়াং খুব বেশি বাংলা বলতে পারে না। তবু বারবার সখির দিকে তাকিয়ে হাসে।
সখির মুখেও তখন অন্যরকম আলো।
কিন্তু পরিবারের আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তাই বাড়তে থাকল। কারণ দং লিয়াংয়ের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। সে দ্রুত বিয়েটা সেরে ফেলতে চাইছে। সে আবার দোভাষী সাথে করে নিয়ে এসেছে। তাই কথা চালাচালি করতে কারো অসুবিধা হলো না।
সখির দুলাভাই সফর আলী তাকে ডেকে বলল—
—ভাই, আপনার কথা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু এত তাড়াহুড়া কেন?
দং লিয়াং হাত-পা নেড়ে যতটুকু পারে বোঝাল—
—ভিসার মেয়াদ আছে নয় দিন। আমাকে যেতে হবে। কিন্তু আমি সখিকে বিয়ে করতে চাই। আমি আবার আসব।
সফর আলী বলল—
—তাইলে এখন যান। কাগজপত্র ঠিক করেন। আবার আসেন। তখন ধুমধাম করে বিয়ে হবে।
দং লিয়াং কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল—
—আমি ফিরে আসব। সখিকে আমি বিয়ে করব।
কিন্তু পরিবারের সন্দেহ তখনও কাটেনি।
সখির নানা মৌলভী মদরিস আলী তালুকদার ছিলেন বেশ অভিজ্ঞ মানুষ। জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন। তিনি সবাইকে ডেকে বললেন—
—ভালোবাসা তো আজকাল কতই দেখছি। কিন্তু বিয়ের সিদ্ধান্ত শুধু ভালোবাসা দিয়ে নেওয়া যায় না। মানুষটারে জানতে হয়, তার পরিবার জানতে হয়, কাগজপত্র দেখতে হয়। বিদেশি মানুষ হইলে আরও বেশি যাচাই করতে হয়।
নানা আরও বললেন—
—বিদেশে বিয়ের কথা বলে, বিশেষ করে চীন দেশে অনেক মেয়েদের নিয়ে গিয়ে প্রতারণা বা অবৈধ কাজে জড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কথাও মাঝে মাঝে শোনা যায়। সব মানুষ এমন—এ কথা ঠিক না। কিন্তু এমন ঝুঁকির কথা যখন জানা আছে, তখন চোখ বন্ধ করে মেয়েকে তুলে দেওয়া যায় না।
হেলন সঙ্গে সঙ্গে বলল—
—নানা ঠিকই কইছেন। সখির জন্য এত টান থাকলে অপেক্ষা করুক। সত্যি হলে আবার আসবেই।
সখি চুপ করে ছিল। তার ভেতরে তখন দুটো মন লড়াই করছে। এক মন বলছে, দং লিয়াং সত্যিই তাকে ভালোবাসে। আরেক মন বলছে, পরিবারের মানুষগুলো কি তবে সবাই ভুল ভাবছে?
এর মধ্যে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলো। পুলিশও পরিস্থিতি দেখে দং লিয়াংকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করল, যাতে সে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার বিষয়টি ঠিক করতে পারে।
বিদায়ের মুহূর্তটা ছিল অদ্ভুত।
সখি উঠোনের এক পাশে দাঁড়িয়ে। দং লিয়াং অন্য পাশে। মাঝখানে অনেক মানুষ। অথচ দুজনের চোখ যেন শুধু একে অন্যকেই খুঁজছে।
দং লিয়াং বলল—
—সখি, আমি আবার আসব।
সখির চোখে পানি জমে উঠল।
সে আস্তে বলল—
—আগে সব ঠিক করে এসো।
দং লিয়াং মাথা নাড়ল।
—আমি আসব।
গাড়ি চলে গেল। ধুলোর মধ্যে দং লিয়াংয়ের শেষ দেখা মুখটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
হেলন সখির পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
—কাঁদিস না। যদি সত্যি ভালোবাসে, আবার আসবে।
সখি চোখ মুছে বলল—
—আর যদি না আসে?
হেলন একটু হেসে বলল—
—তাইলে বুঝবি, তোর ভাগ্যে ‘সুজনসখী’ লেখা ছিল না!
সখী এবার হেসে ফেলল। চোখের পানি আর হাসি একসঙ্গে মিশে গেল।
সখিপুরের সেই ছোট্ট গ্রামটিতে এরপর অনেক দিন দং লিয়াংকে নিয়ে আলোচনা চলল। কেউ বলল, সে সত্যিই সখিকে বিয়ে করতে এসছিল। কেউ বলল, পরিবার ঠিক কাজই করেছে। কেউ আবার অপেক্ষা করতে লাগল—চীনা জামাই কি সত্যিই ফিরে আসে?
কিন্তু সখির জন্য গল্পটা শুধু ভাললাগার গল্প হয়ে রইল না। সে বুঝল, ভালোবাসা মানুষকে সাহসী করে ঠিকই, কিন্তু বিয়ের মতো জীবনের বড় সিদ্ধান্তে একটু সন্দেহ, একটু যাচাই আর পরিবারের অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো ভালোবাসারই অংশ।
আর দং লিয়াং?
সে সত্যিই ফিরে আসবে কি না, সেই উত্তর তখনও সময়ের কাছে জমা রইল।
লন্ডন, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬