ব্রিটেন সংবাদ

ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পথে বার্নহাম, অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকির আশঙ্কা

ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পথে বার্নহাম, অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকির আশঙ্কা

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৬ সেপ্টেম্বর:

ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। তাঁর সরকারের দাবি, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো হলে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ইউরোপমুখী নীতি উল্টো ব্রিটেনের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই বার্নহাম ব্রেক্সিটকে ব্রিটেনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। গত ১ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে প্রথম বড় বক্তব্যে তিনি বলেন, ব্রেক্সিটের পর দেশ এক দশকের কম প্রবৃদ্ধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাঁর মতে, গত চার দশকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অর্থনীতির বেসরকারিকরণ ও শিল্পভিত্তি দুর্বল হওয়ার পর ব্রেক্সিট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

তবে বার্নহামের সরকারের বর্তমান অবস্থান সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার নয়। ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত ‘রেড লাইন’ অনুযায়ী একক বাজার, কাস্টমস ইউনিয়ন বা অবাধ চলাচলের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। বরং বিদ্যমান চুক্তির সীমার মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃষি, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে আসন্ন যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ বৈঠক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর জুলাইয়ের নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়েছিল। এখন শরৎকালে, সম্ভাব্যভাবে নভেম্বরের দিকে, নতুন বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকেও বার্নহাম ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি সামনে আনেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে কৃষি ও ইস্পাত শিল্পকে ইউরোপীয় বাজারে আরও ভালো অবস্থান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘Made in Europe’ নীতিতে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও তাঁর সরকার প্রকাশ করেছে।

বার্নহামের যুক্তি, ব্রিটেনের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপ। ফলে অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য বাধা কমানো গেলে ব্রিটিশ ব্যবসা লাভবান হবে। তাঁর সরকার ইউরোপের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য নতুন ইউরোপীয় মোবিলিটি ব্যবস্থার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও বিরোধীদের একাংশের প্রশ্ন—ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কি সত্যিই ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধির মূল সমস্যাগুলো সমাধান করবে?

ব্রিটিশ অর্থনীতি বর্তমানে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ ঋণ ও বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের সুদের চাপে রয়েছে। বার্নহাম সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি বন্ডের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাড়তে থাকা ঋণগ্রহণের ব্যয় সরকারের প্রথম বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বার্নহামকে প্রকাশ্যে বলতে হয়েছে, তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো ‘আর্থিক দায়িত্বশীলতার’ ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।

সমালোচকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে গিয়ে ব্রিটেন যদি একের পর এক ছাড় দেয়, তাহলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে রাজনৈতিক ও আর্থিক মূল্য বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়ার বিনিময়ে ব্রিটেনকে তরুণদের চলাচল, শিক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে হতে পারে।

অন্যদিকে ইইউপন্থীদের যুক্তি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দাবি, ব্রেক্সিটের ফলে তৈরি বাণিজ্যিক বাধা ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য ব্যয় বাড়িয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি দাবি করেছেন, ব্রিটেনের একক বাজারে ফেরার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর দলের মতে, ব্রেক্সিটের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং বাণিজ্য বাধা কমানো প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি।

অর্থাৎ বার্নহামের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাঁকে ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো সমঝোতায় যাওয়া যাবে না, যা ব্রিটিশ শিল্প ও ব্যবসার ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করে।

বিশেষ করে ইস্পাত ও কৃষি খাত নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থান দেখাচ্ছে, সরকার নিজেও ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন। বার্নহাম বলেছেন, ইউরোপের ‘Made in Europe’ নীতি ব্রিটিশ ইস্পাত শিল্পের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং তাই নতুন সম্পর্কের কাঠামোয় ব্রিটিশ স্বার্থ সুরক্ষিত করা জরুরি।

ফলে বার্নহামের ‘ইইউ রিসেট’ এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা ব্রেক্সিটের ক্ষত সারানোর উদ্যোগ নয়; এটি তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলেরও বড় পরীক্ষা।

ব্রিটেন কি ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে, নাকি অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকেই সীমিত করবে—আগামী মাসগুলোর আলোচনাই তার উত্তর দেবে।

বার্নহাম ইতিমধ্যে বলেছেন, তিনি ব্রিটেনকে ইউরোপের আরও কাছাকাছি নিতে চান। তবে তাঁর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন কি ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধির পথ খুলবে, নাকি সংকটে থাকা অর্থনীতির জন্য এটি নতুন এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে?