ব্রিটেন সংবাদ
আশ্রয় আবেদনে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ, ১০০টির মধ্যে একটি সত্য দাবি
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৭ সেপ্টেম্বর:
যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রতারণা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ তুলেছেন হোম অফিসের এক হুইসেলব্লোয়ার। তাঁর দাবি, হাজার হাজার আবেদন যাচাইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর ধারণা—১০০টি আশ্রয় আবেদনের মধ্যে সর্বোচ্চ একটি প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের আশ্রয়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে এটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়। পরিচয় গোপন রাখা ওই কর্মকর্তা নিজের কর্ম-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু আবেদনকারী সাজানো গল্প, নথি ও পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
একই গল্প ঘুরছে বারবার
ইরাকি কুর্দিদের কয়েকশ আবেদন পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, অনেক আবেদনে দাবি করা হয়েছে—আবেদনকারীর সঙ্গে কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের সম্পর্ক ছিল এবং এ কারণে তাঁরা বিপদের মুখে পড়েছেন।
একই ধরনের গল্প এত বেশি আসতে থাকে যে বিষয়টি কর্মকর্তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয় বলে তাঁর দাবি। তাঁর অভিযোগ, গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নথি ও অন্যান্য প্রমাণও তৈরি করা হচ্ছে।
সমকামী পরিচয় নিয়েও সাজানো আবেদনের অভিযোগ
পাকিস্তানি আবেদনকারীদের একটি অংশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতার অভিযোগ করেছেন তিনি।
তাঁর দাবি, কয়েকশ আবেদনকারী সমকামী সম্পর্কের কারণে নিজ দেশে বিপদের কথা বলেছেন এবং একই ব্যক্তির লেখা সমর্থনপত্র ব্যবহার করেছেন। কিছু আবেদনে একই ধরনের ছবিও পাওয়া গেছে বলে তাঁর দাবি।
তবে যৌন পরিচয়ের কারণে নিপীড়নের শিকার হওয়া বৈধ আশ্রয়ের কারণ হতে পারে। অভিযোগটি হলো—মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা।
বাংলাদেশিদের আবেদনে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের কিছু আবেদন নিয়েও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, কিছু আবেদনকারী নিজেদের আওয়ামী লীগ বা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং রাজনৈতিক কারণে দেশে ফিরলে ঝুঁকির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের রাজনৈতিক পদ, সংগঠনের কাঠামো ও তাঁদের কথিত দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হলে উত্তরে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, কিছু আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া পুলিশ ও আদালতের নথিতেও মিল বা অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ নির্দিষ্ট কিছু আবেদন ও ওই কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সাক্ষাৎকারের দীর্ঘ বিরতিই কি সুযোগ তৈরি করছে?
প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের পর বিস্তারিত সাক্ষাৎকার হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। হুইসেলব্লোয়ারের দাবি, এই সময়ের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের বক্তব্য প্রস্তুত, পরামর্শ গ্রহণ ও নতুন নথি সংগ্রহের সুযোগ পান।
চিকিৎসাজনিত কারণ দেখিয়ে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগও কেউ কেউ নেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
প্রত্যাখ্যানের চেয়ে অনুমোদন সহজ?
হোম অফিসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও অভিযোগ করেছেন ওই কর্মকর্তা।
তাঁর দাবি, আবেদন অনুমোদনের তুলনায় প্রত্যাখ্যান করতে অনেক বেশি ব্যাখ্যা দিতে হয়। আবেদনকারীর বক্তব্যের প্রতিটি অসঙ্গতি তুলে ধরতে হয়। ফলে কিছু কর্মকর্তার কাছে অনুমোদনই তুলনামূলক সহজ হয়ে দাঁড়ায়।
আশ্রয়প্রার্থীদের ‘কাস্টমার’ হিসেবে উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সরকারি হিসাব কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে
হুইসেলব্লোয়ারের এক শতাংশের দাবির সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের সরাসরি মিল নেই।
জুন ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৯৪টি প্রাথমিক আশ্রয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৩৯৪ জন সুরক্ষা পেয়েছেন—প্রায় ৩৮ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল প্রায় ৭৭ শতাংশ।
তবে অনুমোদন মানেই দাবি সম্পূর্ণ সত্য এবং প্রত্যাখ্যান মানেই মিথ্যা—এমন সরল ব্যাখ্যা করা যায় না। আপিল ও অন্যান্য আইনি বিষয়ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
নিজ দেশের সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা
কোনো আবেদনকারী নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি করলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সবসময় তাঁর দেশের সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করতে পারে না। এতে প্রকৃত বিপন্ন ব্যক্তির পরিচয় ফাঁস হয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতা ভুয়া নথি ব্যবহারকারীদের সুযোগ দিতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন হুইসেলব্লোয়ার।
আশ্রয়ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
অভিযোগটি এমন সময়ে এসেছে, যখন ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
রোববার ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূল থেকে প্রায় ১৪০ জন একটি নৌকায় যুক্তরাজ্যের দিকে আসেন। পরে ব্রিটিশ লাইফবোট তাঁদের উদ্ধার করে। একই দিন পোর্টসমাউথে প্রায় ৫০০ মানুষ অভিবাসীদের আগমন নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
হোম অফিসের অবস্থান
হোম অফিস জানিয়েছে, প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়। প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা আবেদনকারীর বক্তব্য, নথি ও সংশ্লিষ্ট দেশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।
প্রতারণা বা ভুল তথ্য প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল এবং প্রয়োজনে দেওয়া সুরক্ষা প্রত্যাহার করা যায়। সরকার দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি এবং ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন আইন কার্যকর করার কথাও জানিয়েছে।
আসল সংকট বিশ্বাসযোগ্যতার
‘১০০টির মধ্যে একটি আবেদন সত্য’—এটি কোনো সরকারি হিসাব নয়। এর সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীন গবেষণা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগটি আশ্রয়ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রকৃত শরণার্থীকে সুরক্ষা দেওয়া যেমন দায়িত্ব, তেমনি মিথ্যা পরিচয়, সাজানো গল্প ও জাল নথি ঠেকানোও জরুরি।
কারণ ভুয়া আবেদন বাড়লে প্রকৃত শরণার্থীরাও সন্দেহের মুখে পড়তে পারেন। তাই যুক্তরাজ্যের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—প্রকৃত বিপন্ন মানুষকে দ্রুত সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করা।