ব্রিটেন সংবাদ
‘গডজিলা’ এল নিনোর দাপট, ব্রিটেনের খাবারের বাজারে বড় সংকটের আশঙ্কা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৭ সেপ্টেম্বর:
ব্রিটেনের সামনে এবার যুদ্ধ বা জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি নতুন এক বৈশ্বিক ঝুঁকি—অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো। এর সম্ভাব্য তীব্রতা বোঝাতে আবহাওয়াবিদ ও সংবাদমাধ্যমে ইতোমধ্যে ‘গডজিলা এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ‘গডজিলা’ কোনো আনুষ্ঠানিক আবহাওয়া শ্রেণিবিন্যাস নয়; এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতে ব্যবহৃত অনানুষ্ঠানিক উপমা।
২০২৬ সালের এই এল নিনো ইতোমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) পূর্বাভাস অনুযায়ী এর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, এবারের ঘটনাটি রেকর্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে।
খাবারের বাজারে কেন ভয়
এল নিনো সরাসরি ব্রিটেনকে আঘাত করে না। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাত, খরা, তাপমাত্রা ও ঝড়ের ধরন বদলে দিতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা, দাবানল ও ফসলহানি বাড়তে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে ব্রিটেনেও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ব্রিটেন তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে বিশ্বের যেসব দেশে এল নিনোর কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেসব দেশ থেকে আসা পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব ব্রিটিশ সুপারমার্কেটেও পৌঁছাতে পারে।
চা, কফি, চাল, ফল, কোকো, চিনি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটেনের নিজস্ব কৃষিও এ বছরের তীব্র তাপ, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা ও পানির সংকটে চাপের মধ্যে রয়েছে।
কৃষকেরাও ইতোমধ্যে চাপে
ব্রিটেনের কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ খরা ও তীব্র গরমের কারণে কোথাও কোথাও ফসল উৎপাদনের ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি, সার ও ডিজেলের ব্যয়ও কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে হেরেফোর্ডশায়ারের এক তৃতীয় প্রজন্মের কৃষকের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, যিনি খাদ্যের জন্য ফসল উৎপাদনের বদলে জমির ফসল জৈব-জ্বালানি তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন। তার যুক্তি—বর্তমান আবহাওয়া ও উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকি আর আগের মতো লাভজনক নয়।
এমন প্রবণতা বাড়তে থাকলে সেটি শুধু কৃষকের সমস্যা থাকবে না; দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
২০২৭ নিয়ে আরও বড় শঙ্কা
এল নিনোর প্রভাব শুধু খাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের ওপর নতুন করে এল নিনোর উষ্ণতা যোগ হওয়ায় ২০২৭ সাল রেকর্ড উষ্ণ বছর হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।
জাতিসংঘও সতর্ক করেছে, শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে খরা, বন্যা ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মিলিত হলে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের অতিরিক্ত ক্ষুধার ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
ব্রিটেনের জন্য সতর্কবার্তা
ব্রিটিশ সরকারও বিষয়টিকে কেবল দূরের কোনো জলবায়ু ঘটনা হিসেবে দেখছে না। পরিবেশমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ঈগল নাগরিকদের জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য কয়েক দিনের খাদ্য ও পানির মজুত রাখার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার জলসম্পদ ও অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো—এল নিনো কোনো এককভাবে নির্ধারিত বিপর্যয়ের নাম নয়। এটি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে খরা, আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার সম্ভাবনা বাড়ায়। ফলে ‘গডজিলা’ শব্দটি আতঙ্ক তৈরির চেয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা বোঝাতেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রিটেনের জন্য তাই আসল প্রশ্ন শুধু আবহাওয়া কেমন থাকবে তা নয়। প্রশ্ন হলো—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে ফসল কমে গেলে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে এবং খাদ্যের দাম বাড়লে ব্রিটিশ খাদ্যব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।
প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি হয়তো ব্রিটেন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। কিন্তু সেই উষ্ণতার ঢেউ যদি বিশ্বের কৃষিক্ষেত্র পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়, তাহলে তার প্রভাব ব্রিটিশ পরিবারের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।