ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৫।। খেলা হয় আমেরিকায়, লাশ পড়ে বাংলায়

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৫।।  খেলা হয় আমেরিকায়, লাশ পড়ে বাংলায়

।। খেলা হয় আমেরিকায়, লাশ পড়ে বাংলায়।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

উৎসর্গ

“সেইসব আবেগী বেকুবদের জন্য, যারা দূরের মাঠের হার-জিতে কাঁদে, কিন্তু পাশের মানুষের নীরব কষ্ট দেখতে পায় না।”

রাত তখন অনেক গভীর। কুষ্টিয়ার ছোট্ট গ্রাম পশ্চিম গট্রিয়ার আকাশে চাঁদ ঝুলে আছে। গ্রামের এক কোণে রতনের ঘরে আলো জ্বলছে। টেলিভিশনের সামনে বসে আছে সে। চোখে উত্তেজনা, গায়ে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আজ তার—ব্রাজিলকে জেতানো।

যদিও রতনের হাতে কোনো বল নেই, পায়ে কোনো বুট নেই, মাঠে নামার সুযোগও নেই। তবুও সে ঘামছে, চিৎকার করছে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে রাগ করছে। সে রাজমিস্ত্রির সহকারি হিসাবে কাজ করে। রতনের বয়স মাত্র বিশ। ঘরে কিশোরী স্ত্রী ও দুই মাসের শিশু কন্যা।

বাড়ির পাশেই শ্বশুরবাড়ি। কন্যাসন্তান হওয়ার পর থেকে তাঁর স্ত্রী সেখানেই আছে।  রতন আজ ঘরে একা। চুটিয়ে খেলাটা দেখতে হবে। স্ত্রী আর সন্তান না থাকায় রতন আজ বেশ খুশি খুশি মনে টিভিতে খেলা দেখতে বসে। কাল সকালে রতনকে কাজে বেরুতে হবে। তবুও বিশ্বকাপ খেলার শুরু থেকেই সে রাত জেগে সব খেলা দেখে। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে ব্রাজিল।

পাশে বসা কুদ্দুস চাচা পান চিবাতে চিবাতে বলেন—

—ওরে রতন, তুই এত চিন্তা করিস কেন? ব্রাজিল হারলে কি নেইমার এসে তোর রাজমিস্ত্রির বেতন দিয়ে যাবে?

রতন বিরক্ত চোখে তাকায়।

—চাচা, ফুটবলের আবেগ বুঝবেন না।

কুদ্দুস চাচা মাথা নেড়ে বলেন—

—আবেগ বুঝি বাবা, কিন্তু বিদ্যুতের বিল আর চালের দামও একটু বুঝতে হয়।

রতন হাসে। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকে না।

হাজার হাজার মাইল দূরে আমেরিকার ঝলমলে স্টেডিয়ামে আলো জ্বলছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করে তৈরি মাঠে ফুটবলাররা দৌড়াচ্ছে। দর্শক গ্যালারিতে পতাকা উড়ছে। ক্যামেরা ঘুরছে। বিজ্ঞাপন চলছে। পৃথিবী দেখছে।

আর বাংলাদেশের এক গ্রামের ঘরে একজন যুবক নিজের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য যুদ্ধ খেলছে।

শেষ বাঁশি বাজে।

ব্রাজিল হেরে যায়।

আমেরিকার স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়রা মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ে। কেউ কয়েক মিনিট পর হোটেলে ফিরে যায়। কেউ সামাজিক মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে। কেউ পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নেয়।

কিন্তু রতনের রাত আর আগের মতো থাকে না।

সে চুপচাপ টেলিভিশন বন্ধ করে। বিছানায় যায়। বাইরে তখন কুকুর ডাকছে।

সকালে গ্রামের মানুষ আরেকটি খবর নিয়ে জেগে ওঠে।

রতন নেই।

পরিবারের সদস্যরা জানালার ফাঁক দিয়ে তাঁকে ঘরের ভেতরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়।

যে ছেলেটি রাতে ব্রাজিলের হারের কষ্ট নিয়ে ঘুমাতে যায়, সকালে তাকে নিজের ঘর থেকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গ্রামের মানুষ হতবাক।

কেউ বলে—

—ব্রাজিল হারার দুঃখে এমন করেছে!

কেউ মাথা নাড়িয়ে বলে—

—মানুষের বুকের ভেতরের খবর কি শুধু ফুটবল দিয়ে বোঝা যায়?

এদিকে আমেরিকার স্টেডিয়ামে নতুন ম্যাচের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। সেখানে নতুন আলো, নতুন দর্শক, নতুন উত্তেজনা।

গ্রামে রতনের উঠোনে নীরবতা।

দুই মাসের ছোট্ট মেয়েটি কিছুই বোঝে না। সে শুধু বাবার কোলে উঠতে চায়। কিন্তু বাবার হাত আর তাকে ছুঁতে আসে না।

রতনের বাবা হোসেন মিস্ত্রি উঠোনে বসে থাকেন। চোখে পানি।

এক প্রতিবেশী এসে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন—

—চাচা, শুনলাম ব্রাজিলের জন্যই এমন হয়েছে।

হোসেন মিস্ত্রি কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন—

—মানুষের জীবন এত সস্তা না বাবা। একটা খেলা হয়তো শেষ ধাক্কা দেয়, কিন্তু মানুষের ভেতরে কত ঝড় চলে, সেটা কেউ দেখে না।

কথাটা শুনে সবাই চুপ হয়ে যায়।

কারণ সত্যি কথা হলো, ব্রাজিলের হার কোনো মানুষের জীবন নেওয়ার কারণ হতে পারে না। হয়তো সেই রাতে রতনের বুকের ভেতর জমে থাকা অনেক অজানা কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হতাশা একসঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

গ্রামের চায়ের দোকানে আবার আলোচনা শুরু হয়।

আলম সাহেব শিক্ষিত মানুষ। পোস্ট মাস্টার ছিলেন। সবাই তাঁকে খুব সম্মান করে এলাকায়। তিনি বলেন—

—আমরা বিদেশের খেলোয়াড়দের জন্য রাত জাগি, কিন্তু পাশের বাড়ির মানুষের মন খারাপটা দেখি না। ব্রাজিলের পরাজয়ে কষ্ট পেয়ে এর মধ্যে দু’জন সমর্থক হার্ট এ্যাটাক করেছে। এইমাত্র পত্রিকায় পড়লাম।

আরেকজন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে—

—টিভির পর্দার মানুষদের জন্য চোখের পানি ফেলি, কিন্তু ঘরের মানুষের চোখের পানি অনেক সময় দেখি না।

সবাই চুপ করে যায়।

দূরে কয়েকজন শিশু মাঠে ফুটবল খেলছে। তারা হাসছে, দৌড়াচ্ছে। একজন গোল করে চিৎকার করছে।

জীবন তাদের শেখাচ্ছে—খেলা থাকবে, হার-জিৎ থাকবে। কিন্তু মানুষের জীবন কোনো ম্যাচ নয়, যেখানে পরাজয় মানেই শেষ বাঁশি।

আমেরিকার মাঠে আবার খেলা শুরু হয়। ক্যামেরা আবার জ্বলে ওঠে। দর্শক আবার চিৎকার করে।

আলম সাহেব তরুণদের লক্ষ্য করে বলেন—

খেলা হয় হাজার মাইল দূরে, কিন্তু আবেগের ভুল বোঝাবুঝির মূল্য কখনো কখনো পড়ে যায় একেবারে নিজের ঘরের উঠোনে। এই বেশি বেশি আবেগের বেগে, তাহলে বাংলার মানুষ প্রতি বিশ্বকাপে কি-  এভাবে কেউ কেউ  জীবন দিতে থাকবে?

লন্ডন, ৭ জুলাই ২০২৬