ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। মেসি—একাই একশো। ১৪ ।। ২য় ও ৩য় পর্ব

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প  ।। মেসি—একাই একশো।  ১৪ ।। ২য়  ও  ৩য় পর্ব

।। মেসি—একাই একশো ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ


বিশ্বজুড়ে সেই সব স্বপ্নবাজ শিশুদের, যারা বিশ্বাস করে—উচ্চতা নয়, হৃদয়ের শক্তিই মানুষকে মহৎ করে তোলে।

রে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে আসে।

বাইরে ক্যানারি ওয়ারফের কাঁচের অট্টালিকাগুলো সন্ধ্যার আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। নদীর ওপারে মানুষজন এখনও হাঁটছে। কেউ জানেই না, এই পেন্টহাউসের ভেতরে এখন একটি গল্প দরজায় কড়া নাড়ছে।

ওমর সিদ্দিকী এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে ভেতরে আসতে বলেন।

— আসুন, প্লিজ।

বৃদ্ধ ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকেন। তার হাতে ধরা ফুটবলটি নতুন নয়। চামড়ার গায়ে অসংখ্য আঁচড়। কোথাও কোথাও সেলাই উঠে এসেছে। কিন্তু বলটিকে তিনি এমন যত্নে ধরে আছেন, যেন এটি কোনো জাদুঘরের অমূল্য সম্পদ।

শিহাব রহমান চোখ সরাতে পারেন না।

তিনি আস্তে জিজ্ঞেস করেন—

— এই বলটা... আপনি কোথায় পেলেন?

বৃদ্ধ হালকা হেসে বলেন—

— প্রশ্নটা সবাই করে। কিন্তু উত্তরটা শুনতে খুব কম মানুষই ধৈর্য ধরে।

ঘরের সবাই আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দেন।

— আমার নাম আলেহান্দ্রো মোরেনো। জন্ম আর্জেন্টিনার রোজারিওতে। এখন লন্ডনে মেয়ের কাছে থাকি।

রোজারিও নামটি উচ্চারণ হতেই শিহাব রহমানের চোখে অন্যরকম আলো ফুটে ওঠে।

— রোজারিও?

— হ্যাঁ।

— তাহলে তো আপনি...

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বলেন—

— হ্যাঁ, আমি সেই শহরের মানুষ, যেখানে এক ছোট্ট ছেলে দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার পরও বল নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইত না।

ইহতিশাম উত্তেজিত হয়ে উঠে বসে।

— আপনি... আপনি কি মেসিকে চিনতেন?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন।

তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেন—

— "চিনতাম" শব্দটা বড় অদ্ভুত। একটা শহরে হাজার হাজার মানুষ থাকে। সবাই সবাইকে চেনে না। কিন্তু কোনো কোনো শিশুকে পুরো শহর চিনে ফেলে, কারণ সে অন্যরকম।

ড. নাওমি জিজ্ঞেস করেন—

— কেমন অন্যরকম?

বৃদ্ধ উত্তর দেন—

— অন্য বাচ্চারা গোল করলে আনন্দে চিৎকার করত। সে গোল করার পর আবার বলটা কুড়িয়ে নিয়ে মাঝমাঠে চলে যেত। যেন আরেকটা গোল না করলে তার দিন শেষ হবে না।

ঘরে কেউ কথা বলে না।

শুধু বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা যায়।

— তার চোখে তখনই আমি একটা অদ্ভুত ক্ষুধা দেখতাম। সেটা জয়ের ক্ষুধা নয়। শেখার ক্ষুধা।

ম্যালকম অ্যাডেইয়েমি বললেন—

— মহান খেলোয়াড়দের মধ্যে এই ক্ষুধাটা কখনও মরে না।

শিহাব রহমান ধীরে বলেন—

— তারপর?

বৃদ্ধ বলটির ওপর হাত বুলিয়ে বলেন—

— তারপর একদিন খবর ছড়িয়ে পড়ে, ছেলেটার শরীরে সমস্যা ধরা পড়েছে।

ইহতিশাম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে—

— কী সমস্যা?

প্রফেসর জুলিয়ান উত্তর দিতে যান, কিন্তু বৃদ্ধ হাত তুলে তাকে থামান।

— আমি বলি।

তিনি গভীর শ্বাস নেন।

ডাক্তাররা বলেন, তার শরীরে গ্রোথ হরমোন ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না। চিকিৎসা না হলে সে স্বাভাবিকভাবে বড় হবে না।

ইহতিশামের মুখ মলিন হয়ে যায়।

— তখন কি সে ফুটবল ছেড়ে দেয়?

বৃদ্ধ হেসে ফেলেন।

— না বাবা।

— তাহলে?

— সে বলটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

ঘরের সবাই নিঃশব্দে শুনছে।

বৃদ্ধ বলেন—

মেসির বাবা হোর্হে সারাদিন পরিশ্রম করেন। মা সেলিয়া সংসার সামলান। চিকিৎসার খরচ দিন দিন বাড়তে থাকে। কিন্তু আমি কখনও শুনিনি, তারা ছেলেটার সামনে হতাশার কথা বলেছেন।

আরিবা আস্তে বলেন—

— সব বড় মানুষের পেছনে হয়তো এমন কিছু সাধারণ মানুষ থাকেন, যাদের কথা ইতিহাস খুব কমই লিখে।

শিহাব রহমান মাথা নাড়েন।

— ঠিক বলেছেন। মেসির গল্প শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটা একটা পরিবারের গল্প।

ইহতিশাম হঠাৎ বলে ওঠে—

— কিন্তু এত কষ্টের পরও সে কি কখনও অভিযোগ করেছে?

বৃদ্ধ একটু হেসে মাথা নাড়েন।

— অভিযোগ করার সময়ই তো তার ছিল না। সে খেলত।

আবার খেলত।

আরও খেলত।

ড. নাওমি ধীরে বলেন—

— এটাই মানসিক দৃঢ়তা। যে মানুষ নিজের কষ্টকে অজুহাত বানায় না, সে একদিন নিজের কষ্টকেই শক্তিতে বদলে ফেলে।

ঘরের ভেতর হালকা নীরবতা নেমে আসে।

ঠিক তখনই টেলিভিশনে আবার মেসির সাক্ষাৎকার দেখানো শুরু হয়।

ম্যাচ শেষে সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করছেন—

"আজ আপনি আবারও রেকর্ড গড়লেন। কেমন লাগছে?"

মেসি শান্ত গলায় উত্তর দেন—

"রেকর্ডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দল। আজ আমরা জিতেছি, কিন্তু অনেক ভুলও করেছি। সেই ভুলগুলো ঠিক না করলে সামনে এগোনো কঠিন হবে।"

ইহতিশাম বিস্ময়ে বলে—

— এত বড় খেলোয়াড় হয়েও নিজের ভুলের কথা আগে বলছে!

শিহাব রহমান মৃদু হেসে বলেন—

— এই কারণেই মানুষ তাকে শুধু তার পায়ের জন্য নয়, তার চরিত্রের জন্যও মনে রাখবে।

বৃদ্ধ আলেহান্দ্রো তখনও পুরোনো বলটির ওপর হাত রেখে বসে আছেন।

হঠাৎ তিনি এমন একটি কথা বলেন, যা শুনে ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

— জানেন... এই বলটার সঙ্গে মেসির একটা সম্পর্ক আছে।

সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকায়।

শিহাব রহমানের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে থাকে।

তিনি ধীরে জিজ্ঞেস করেন—

— কী সম্পর্ক?

বৃদ্ধ উত্তর দেন না।

শুধু বলটি টেবিলের ওপর আস্তে করে রেখে বলেন—

— সেটা বলব।

কিন্তু তার আগে আপনাদের জানতে হবে, কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবলার একদিন নিজের উচ্চতা নিয়ে নয়, নিজের স্বপ্ন নিয়ে লড়াই শুরু করেছিল।

পুরোনো চামড়ার বলটি যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে।

মনে হয়, তার ভেতরেও একটি গল্প আটকে আছে।

আর সেই গল্প এখনও কেউ শোনেনি।

।। মেসি—একাই একশো ।।

।। তৃতীয় পর্ব ।।

উৎসর্গ


সব বিনয়ী বিজয়ীদের প্রতি, যারা সাফল্যের চূড়ায় উঠেও মানুষ হয়ে থাকতে জানেন।

ক্যানারি ওয়ারফের কাঁচের দেয়ালে তখন গোধূলির শেষ আলো লেগে আছে। টেমস নদীর বুক দিয়ে পর্যটকবাহী নৌকা ধীরে ভেসে যাচ্ছে। দূরে আকাশচুম্বী ভবনের কাঁচে সূর্যের শেষ সোনালি রেখা ঝলসে উঠছে। বাইরে গরমের সন্ধ্যা। নদীর ধারে মানুষ হাঁটছে, কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ ফুটবল হাতে ছবি তুলছে। পৃথিবী যেন উৎসবের পোশাক পরে আছে।

ঘরের ভেতরে টেলিভিশনে আবারও ভেসে ওঠে মেসির মুখ।

ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন।

ঘরে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দ।

সাংবাদিক শিহাব রহমান রিমোটের ভলিউম একটু বাড়িয়ে দেন।

মেসির কণ্ঠ ভেসে আসে—

"আমরা অনেক ভালো করেছি, আবার অনেক ভুলও করেছি। সামনে আরও কঠিন পথ। আমাদের সেই ভুলগুলো ঠিক করতে হবে।"

রাশেদ চৌধুরী অবাক হয়ে বলেন—

— এই মানুষটা কি সত্যিই নিজের কথা বলছে? যে আজ এগারোটা রেকর্ড গড়ে ফেলেছে, সে নিজের ভুল খুঁজছে!

ড. এলিনর ব্রুকস শান্ত গলায় বলেন—

— এ কারণেই সে বড়। বড় খেলোয়াড়রা জয়ের পরও নিজেদের সমালোচনা করে।

সিনেমা পরিচালক আমিনা হক মৃদু হেসে বলেন—

— বেশির ভাগ নায়ক সিনেমায় নায়ক হয়। এই মানুষটা বাস্তবে নায়ক হতে চায় না, তাই মানুষ তাকে নায়ক বানিয়ে দেয়।

ঘরে আবার নীরবতা।

টেলিভিশনে এবার কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মেসির করমর্দনের দৃশ্য।

তিনি প্রতিপক্ষের একজন তরুণ ফুটবলারের কাঁধে হাত রেখে কিছু বলছেন।

শিহাব রহমান আস্তে বলেন—

— দেখুন, ম্যাচ শেষে সাংবাদিকরা যখন রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করছে, তখন মেসি প্রতিপক্ষের প্রশংসা করছে। সে বলছে, "আমরা জানতাম ম্যাচটা কঠিন হবে। তারা আমাদের অনেক সমস্যায় ফেলেছে।"

ড. সোফিয়া লরেন্স মাথা নাড়েন।

— আত্মবিশ্বাস আর অহংকারের মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম রেখা থাকে। অধিকাংশ মানুষ সেটা দেখতে পায় না। মেসি সম্ভবত সেটার ওপর দিয়েই হাঁটে।

ঠিক তখন ইহতিশাম বলে ওঠে—

— কিন্তু সবাই তো বলে, মেসি সবসময় জিততে চায়।

শিহাব হেসে উত্তর দেন—

— অবশ্যই চায়। কিন্তু সে প্রতিপক্ষকে ছোট করে জিততে চায় না।

রাশেদ চৌধুরী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেন—

ছোটবেলায় হরমোনের অসুখে চিকিৎসার টাকা ছিল না। মানুষ বলেছিল, এই ছেলেটা বড় ফুটবলার হতে পারবে না। আজ সেই মানুষটাই প্রতিটি গোলের পর আকাশের দিকে তাকায়। মনে হয়, সে কাউকে ধন্যবাদ জানায়, কাউকে অপমান করে না।

আমিনা হক বলেন—

— মানুষ সাধারণত সাফল্যের গল্প জানে। কিন্তু সাফল্যের আগে কত অপমান জমা থাকে, সেটা জানে না।

ইহতিশাম ধীরে ধীরে নিজের ফুটবলটা কোলে তুলে নেয়।

সে ফিসফিস করে বলে—

— তাহলে গোল করার চেয়েও কঠিন কাজ আছে?

ড. এলিনর উত্তর দেন—

— আছে।

— কী?

— গোল করার পরও মানুষ হয়ে থাকা।

ঘরে হালকা হাসির ঢেউ ওঠে।

কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও এক ধরনের নীরব শিক্ষা লুকিয়ে থাকে।

ঠিক তখন দরজার কলিংবেল বাজে।

কেয়ারটেকার একটি খাম এনে দেয়।

খামের ওপরে লেখা—

"শিশু ক্যানসার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।"

রাশেদ অবাক হয়ে বলেন—

— এটা আবার কী?

শিহাব খাম খুলে পড়তে শুরু করেন।

চিঠিতে লেখা—

"বিশ্বকাপ উপলক্ষে লিওনেল মেসি ফাউন্ডেশনের অনুদানে আরও কয়েকজন শিশুর চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।"

ঘরে কেউ কথা বলে না।

টেলিভিশনে তখনও গোলের রিপ্লে চলছে।

কিন্তু কারও চোখ আর গোলে আটকে নেই।

সবার চোখ যেন চলে যায় অন্য কোথাও।

ড. সোফিয়া আস্তে বলেন—

— আশ্চর্য! আমরা এতক্ষণ ভাবছি, মানুষটা মাঠে কী করেছে। অথচ মাঠের বাইরে সে আরও বড় কিছু করে যাচ্ছে।

শিহাব রহমান ধীরে ধীরে চিঠিটা ভাঁজ করেন।

তার কণ্ঠ শান্ত।

— রেকর্ড একদিন ভাঙবে। কাপও অন্য কেউ জিতবে। কিন্তু কোনো অসুস্থ শিশুর মুখে যদি আবার হাসি ফিরে আসে, সেই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে না।

ঘরের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা।

টেলিভিশনে ধারাভাষ্যকার বলছেন—

"লিওনেল মেসি... ইতিহাসের আরেকটি দিন..."

শিহাব টেলিভিশনের শব্দ কমিয়ে দেন।

তারপর ইহতিশামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন—

— আজকের সন্ধ্যায় তুমি কী শিখলে?

ছেলেটা একটু ভেবে বলে—

— আগে ভাবতাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানুষ সেই, যে সবচেয়ে বেশি গোল করে।

সে একটু থামে।

তারপর ধীরে ধীরে বলে—

— এখন বুঝছি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানুষ সেই, যে সবচেয়ে বেশি মানুষকে ভালোবাসতে পারে।

ঘরের সবাই চুপ করে থাকে।

বাইরে ক্যানারি ওয়ারফের উঁচু ভবনগুলো একে একে আলোয় ভরে ওঠে।

টেমসের জলে সেই আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে।

মনে হয়, ইতিহাস আসলে ট্রফির ধাতুতে লেখা হয় না।

ইতিহাস লেখা হয় মানুষের হৃদয়ে।

আর কিছু মানুষ আছেন, যাদের নামের পাশে শুধু গোলসংখ্যা নয়, মানবতারও একটি আলাদা পরিসংখ্যান থাকে।

সমাপ্ত।

লন্ডন, ৭ জুলাই ২০২৬