ফুটবলের রাজকুমার নিওনেল মেসিকে নিয়ে ৩ পর্বের ধারাবাহিক অনুগল্প

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৩ ।। মেসি—একাই একশো ।। ১ পর্ব ।।

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৩ ।। মেসি—একাই একশো ।।  ১ পর্ব ।।

মেসি—একাই একশো

।।  ১ম পর্ব ।।

 ।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ
বিশ্বজুড়ে সেই সব স্বপ্নবাজ শিশুদের, যারা বিশ্বাস করেউচ্চতা নয়, হৃদয়ের শক্তিই মানুষকে মহৎ করে তোলে।

জুলাই মাসের লন্ডন।

দিন শেষ হতে চায়, কিন্তু সূর্য যেন বিদায় নিতে রাজি নয়। রাত আটটা পেরিয়ে যায়, তবু ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের ক্যানারি ওয়ারফের কাঁচের অট্টালিকাগুলোর গায়ে সোনালি আলো ঝিলমিল করে। টেমস নদীর জলে সেই আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে, আবার ভেসে যায় পর্যটকবাহী নৌকার ঢেউয়ে।

নদীর ধারের বেঞ্চগুলো মানুষে ভরা। কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ ঠান্ডা কফির কাপ হাতে গল্প করছে। অনেকে খালি গায়ে জগিং করছে। রোদের তাপ এখনও কমেনি। কয়েকজন তরুণী গ্রীষ্মের হালকা পোশাকে হাসতে হাসতে নদীর পাড় ধরে হাঁটছে। পৃথিবীর নানা ভাষা বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছে।

শহর যেন অফিস শেষ হওয়ার পরও ঘুমাতে ভুলে গেছে।

এই শহরের মাঝখানে, ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কুয়ের ধারে একটি পেন্টহাউস। বিশাল কাঁচের দেয়াল। বাইরে তাকালেই মনে হয়, পুরো লন্ডন যেন বসার ঘরের অংশ।

আজ সেখানে একটি ছোট্ট আড্ডা।

বিশ্বকাপের আড্ডা।

বাড়ির মালিক ওমর সিদ্দিকী অতিথিদের স্বাগত জানাতে ব্যস্ত। টেবিলজুড়ে স্প্যানিশ জলপাই, ইতালিয়ান চিজ, বাংলাদেশি চা, ইংলিশ স্কোন—সবকিছু পাশাপাশি সাজানো। যেন খাবারের মধ্যেও পৃথিবীর মানচিত্র আঁকা।

প্রথমে এসে পৌঁছান সাংবাদিক শিহাব রহমান। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্তে খেলা, যুদ্ধ, নির্বাচন, দুর্ভিক্ষ—সবই দেখেছেন। তবু তার চোখে আজও এক ধরনের কৌতূহল রয়ে গেছে।

তারপর আসেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অভিনেতা আরিব খান। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তার পরিচিত মুখ, কিন্তু ফুটবল নিয়ে কথা বলতে বসলেই তিনি যেন আবার স্কুলের ছাত্র হয়ে যান।

ইতিহাসবিদ প্রফেসর জুলিয়ান হিউজ ঢুকতেই বলেন—

— আজ কেউ রাজনীতি নিয়ে কথা বলবে না। আজ পৃথিবীকে গোলাকার প্রমাণ করার দায়িত্ব শুধু ফুটবলের।

ঘরে হাসির ঢেউ ওঠে।

এরপর আসেন ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী . নাওমি কার্টার, সাবেক নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডার ম্যালকম অ্যাডেইয়েমি, আর পনেরো বছরের কিশোর ইহতিশাম—যার চোখে বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন।

সবাই বসতেই বড় পর্দার টেলিভিশনে বিশ্বকাপের হাইলাইটস শুরু হয়।

ম্যাচ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।

আর্জেন্টিনা নাটকীয় লড়াইয়ে জিতেছে।

পর্দায় বারবার দেখা যাচ্ছে একজন মানুষকে।

লিওনেল মেসি।

ইহতিশাম ফিসফিস করে বলে—

— ওর বয়স তো এখন অনেক। তবু সবাইকে পেছনে ফেলে কীভাবে দৌড়ায়?

ম্যালকম হেসে উত্তর দেন—

— শরীর দৌড়ায় পায়ে। কিংবদন্তিরা দৌড়ায় বিশ্বাসে।

শিহাব রহমান কিছু বলেন না। তিনি শুধু পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তার চোখে ফুটবল ম্যাচ নয়—আরেকটি গল্প ভেসে ওঠে।

হয়তো অনেক বছর আগের।

হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তের।

ঠিক তখনই টেলিভিশনের নিচে লাল অক্ষরে ভেসে ওঠে—

"কেপ ভার্দের বিপক্ষে মেসির নতুন বিশ্বরেকর্ড।"

ইহতিশাম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে বসে।

— আবার রেকর্ড!

আরিব মুচকি হেসে বলেন—

— মনে হচ্ছে লোকটা সকালে ঘুম থেকে ওঠে, আর নাশতার আগে একটা রেকর্ড ভেঙে ফেলে।

আবারও হাসি।

শুধু শিহাব রহমানের মুখে হাসি ফুটে না।

তিনি ধীরে ধীরে বলেন—

— রেকর্ডের গল্প সবাই জানে। আমি আজ মানুষটার গল্প শুনতে চাই।

কথাটা এমনভাবে বলা হয় যে, ঘরের ভেতরের হাসি এক মুহূর্তে থেমে যায়।

প্রফেসর জুলিয়ান চশমা খুলে টেবিলে রাখেন।

— মানুষটার গল্প?

শিহাব মাথা নাড়েন।

— আমরা জানি সে কত গোল করেছে। কিন্তু কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, সেটা জানি?

ড. নাওমি চুপচাপ শুনছিলেন।

তিনি বলেন—

— মানসিক শক্তির ইতিহাস লিখতে গেলে মেসির নাম আলাদা অধ্যায় পাবে।

ওমর সিদ্দিকী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন—

— আপনি কি তাকে কাছ থেকে দেখেছেন?

শিহাব উত্তর দিতে গিয়েও থেমে যান।

একটু পরে ধীরে বলেন—

— কাছ থেকে মানুষকে দেখা আর মানুষকে বোঝা—এক জিনিস নয়।

বাইরে হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার টেমসের ওপর দিয়ে উড়ে যায়।

ঘরের কাঁচের দেয়ালে তার আলো ঝলসে ওঠে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ডোরবেল বাজে।

টিং... টং...

সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকায়।

ওমর অবাক হয়ে বলেন—

— এই সময় আবার কে?

দরজা খুলতেই দেখা যায়, প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা লিনেন শার্ট, মাথাভর্তি রুপালি চুল। হাতে পুরোনো চামড়ার একটি ফুটবল।

তিনি মৃদু হেসে বলেন—

— দুঃখিত... আমি কি একটু ভেতরে আসতে পারি?

শিহাব রহমান ভদ্রলোকের হাতে ধরা বলটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্থির হয়ে যান।

তার মুখের রঙ বদলে যায়।

তিনি খুব আস্তে বলেন—

— অসম্ভব...

ঘরে উপস্থিত কেউই বোঝে না, কেন একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক একটি পুরোনো ফুটবল দেখে এতটা বিচলিত হয়ে পড়লেন।

কিন্তু সেই ফুটবলটিই আজ রাতের আড্ডাকে শুধু ফুটবলের গল্পে আটকে রাখবে না।

এটি খুলে দেবে এমন এক দরজা, যার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে রোজারিওর ছোট্ট এক বালক—যে একদিন পৃথিবীকে শেখাবে, মানুষের উচ্চতা নয়, তার স্বপ্নই সবচেয়ে বড়।

(চলবে...)