বাংলাদেশ সংবাদ

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: সংসদে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল, সমাধানে একাধিক পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: সংসদে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল, সমাধানে একাধিক পরিকল্পনা

ঢাকা, ৮সেপ্টেম্বর :

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সংকটের কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঘাটতি কেন এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কী করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নে সরকারের ব্যাখ্যার পাশাপাশি একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, মানুষ আশ্বাস নয়, বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ চায়। সংকট মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে কাজ করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

বাস্তব সংকটের প্রমাণ লোডশেডিংয়ে

সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সরকারি তথ্যেও ঘাটতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫৬৫ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৩৫ মেগাওয়াট।

৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল পাওয়ার গ্রিড। আগের দিনের সন্ধ্যায় প্রকৃত উৎপাদন ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৩০৪ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ কাগজে বড় উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময়ে জ্বালানি, কেন্দ্রের সক্ষমতা, সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সংকটকে তীব্র করছে।

সরকারের দাবি—সংকট কাটাতে ‘প্ল্যান’ আছে

সংসদে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এ জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা আগেই জানিয়েছিল সরকার। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হওয়ার আশা করছে সরকার। তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতিতে মানুষ ভোগান্তিতে আছে।

গ্যাসই বড় বাধা

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা এখন গ্যাস সরবরাহ। সরকারি তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২০২২ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ছিল দৈনিক ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে।

সরকারও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি চালাচ্ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও কয়েকটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়ার আশা করছে সরকার।

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে চাপ

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট সামাল দিতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা সংসদে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

এর মধ্যেই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার আরও চার কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে।

বিরোধী দলের চার প্রস্তাব

সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দল সরকারের সামনে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিল্পকারখানাগুলোকে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া।

এ ছাড়া বিরোধী দলের পক্ষ থেকে—

  • সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে জরুরি জ্বালানি সেল গঠন;
  • কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জন্য দ্রুত জ্বালানি ও এলসি নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানো;
  • বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনার বকেয়া অগ্রাধিকার দিয়ে পরিশোধের

প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার চাইলে তাদের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি দল সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা করতে পারে। তাঁর বক্তব্য, এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৃতিত্বের চেয়ে সংকটের সমাধানই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েও প্রশ্ন

বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও সংসদে নতুন করে সামনে এসেছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, উৎপাদন না হলেও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অর্থ দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার অবশ্য জানিয়েছে, নতুন করে অনুমোদন দেওয়া কিছু রেন্টাল কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ না করলে অর্থ পরিশোধ করা হবে না।

নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ

দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে সরকার।

আগস্টের শুরুতেই সরকার জানিয়েছিল, নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অফশোর বিডিং রাউন্ড চলছে এবং নভেম্বরের মধ্যে এর পরবর্তী ধাপ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর

সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সৌরবিদ্যুৎকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে আমদানি সুবিধা এবং অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার কথা সংসদে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর মাধ্যমে অশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

সংকট কত দ্রুত কাটবে?

সরকারের পূর্বাভাস, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও ৭ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সরকারি ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ফলে কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ আগের পর্যায়ে ফেরার আশা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতির বড় পরীক্ষা হবে উৎপাদন সক্ষমতা নয়, সেই সক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা, তেল ও অর্থ সময়মতো নিশ্চিত করা। কারণ সাম্প্রতিক পাওয়ার গ্রিডের তথ্য দেখাচ্ছে—চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি এখনো কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে।

ফলে সংসদের বিতর্কে রাজনৈতিক দায় চাপানোর পাশাপাশি যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদন সক্ষমতাও আছে; কিন্তু জ্বালানি ও অর্থের সংকটে সেই সক্ষমতা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে? সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে এই ব্যবধান কত দ্রুত কমানো যায় তার ওপর।