বাংলাদেশ সংবাদ

বিষাক্ত বাতাসে ঢাকার জনজীবন চরম ঝুঁকিতে

বিষাক্ত বাতাসে ঢাকার জনজীবন চরম ঝুঁকিতে

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৮ সেপ্টেম্বর:

ঢাকার বাতাসে ধুলা, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্পকারখানার নিঃসরণ এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড রাজধানীর বায়ুর মানকে দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের ফুসফুসের পাশাপাশি হৃদ্‌যন্ত্র ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের ছয়টি বড় শহরের বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে ঢাকা। গবেষণার হিসাবে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে পিএম ২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩। এ সময়ে ঢাকায় বছরে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ জনের অকালমৃত্যুর সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের গবেষণায় ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয় শহরেই বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর প্রবণতা বেড়েছে।

বায়ুদূষণের অন্যতম ক্ষতিকর উপাদান পিএম ২.৫। আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় এসব কণা সহজেই শ্বাসনালির গভীরে এবং ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন এর সংস্পর্শে থাকলে হৃদ্‌রোগ, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষণার হিসাবে, ছয় শহরে পিএম ২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত অকালমৃত্যুর মধ্যে হৃদ্‌রোগে মারা গেছেন প্রায় ৩৭ হাজার ৫১৯ জন। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ জনের। ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গেও বায়ুদূষণের কারণে ৮১১টি মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি অকালমৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে চট্টগ্রামে—১১ হাজার ২০২। রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জনের অকালমৃত্যুর সঙ্গে পিএম ২.৫ দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বায়ুদূষণের ক্ষতি শুধু স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি হচ্ছে। গবেষণায় ছয় শহরে পিএম ২.৫ দূষণের কারণে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ ঢাকার দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। শুষ্ক মৌসুমে নির্মাণস্থলের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া ও অন্যান্য উৎস থেকে আসা কণা বাতাসে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

বাংলাদেশের সামগ্রিক বায়ুমানও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বায়ুমান মূল্যায়নে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দূষিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দেশের বার্ষিক গড় পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত নিরাপদ মাত্রার তুলনায় বহু গুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও বাংলাদেশের মানুষের ওপর বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে। এসব গবেষণায় বায়ুদূষণের কারণে দেশে বিপুলসংখ্যক অকালমৃত্যু এবং মানুষের গড় আয়ু কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও নগরজীবনের সংকট। বিশেষ করে ইটভাটা, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর মতো দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ ও নজরদারির ঘাটতি বড় সমস্যা। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, দূষণের উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।

ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য তাই বিষাক্ত বাতাস এখন আর কেবল পরিবেশের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সংকট। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নগরীর বাতাসের এই ভার ক্রমেই আরও বড় জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।