ব্রিটেন সংবাদ
ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির নতুন ঝুঁকি: রাজপথে নামছে ক্ষোভ, চাপ বাড়ছে অভিবাসীদের ওপর
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৮ সেপ্টেম্বর:
ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি এখন আর শুধু নির্বাচনী প্রচারণার বিষয় নয়—রাজপথের বিক্ষোভ, কট্টর ডানপন্থার উত্থান এবং অভিবাসনকে কেন্দ্র করে জনমতের মেরুকরণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডোভার ও পোর্টসমাউথে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ এবং জার্মানি ও স্পেনে ডানপন্থী দলগুলোর শক্তি বাড়ার ঘটনা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডোভার থেকে পোর্টসমাউথ—বিক্ষোভের নতুন বিস্তার
গত শনিবার ডোভার বন্দরের আশপাশে কয়েকশ কালো পোশাক ও মুখোশধারী বিক্ষোভকারী রাস্তা আটকে দেয়। তাদের আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা বন্ধ করা।
এর মাত্র এক দিন পর পোর্টসমাউথে প্রায় ১৪০ জন আশ্রয়প্রার্থী নিয়ে একটি নৌকা পৌঁছালে সেখানে আবারও বড় বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রক্রিয়াকরণের জন্য নিয়ে যাওয়ার পথ আটকে দেয়। পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুলিশ সদস্য আহত হন।
ব্রিটিশ সরকারের চিফ সেক্রেটারি টু দ্য ট্রেজারি এমা রেনল্ডস ঘটনাটিকে ‘থাগিশ’ ও ভয় দেখানোর আচরণ হিসেবে নিন্দা করেছেন। সরকার বলেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার থাকলেও সহিংসতা, ভয় দেখানো বা জনসাধারণের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু অভিবাসনবিরোধী ক্ষোভ কেন বাড়ছে?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন এখন ভোটের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসন সংকটের পর জনমনে অসন্তোষ বেড়েছে। Reuters-এর উদ্ধৃত একটি জরিপে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক স্প্যানিশ নাগরিক সেউতা পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট। এর সঙ্গে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থনও বেড়েছে।
জার্মানিতেও একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্টে কট্টর ডানপন্থী Alternative for Germany (AfD) আঞ্চলিক নির্বাচনে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে—ক্ষমতাসীন CDU-এর ১৭ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। জাতীয় পর্যায়ের জরিপেও দলটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
অভিবাসনবিরোধিতা AfD-এর রাজনীতির অন্যতম প্রধান উপাদান। অর্থনৈতিক চাপ, আবাসন সংকট, নিরাপত্তা ও জনসেবার ওপর চাপ—এসব বিষয়কে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করে দলটি ভোটারদের সমর্থন আদায় করছে।
ব্রিটেনেও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু অভিবাসন
যুক্তরাজ্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। Reform UK অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছে। দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ এখনো দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখ।
তবে Reform UK-এর অভ্যন্তরীণ আর্থিক বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও অভিবাসন ইস্যুতে দলটির সমর্থকগোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক ডোভার-পোর্টসমাউথ বিক্ষোভে সরাসরি দলীয় নেতৃত্ব না থাকলেও কট্টর ডানপন্থী অনলাইন নেটওয়ার্কগুলোর সংগঠিত ভূমিকা সামনে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—অভিবাসনবিরোধী সব রাজনৈতিক দল বা বিক্ষোভকারী একই ধরনের কট্টরপন্থী নয়। কিন্তু শান্তিপূর্ণ অভিবাসননীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যখন ভয় দেখানো, বর্ণবিদ্বেষ বা সহিংসতার দিকে যায়, তখন সেটি আলাদা নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতির সমস্যা তৈরি করে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বড় অংশই অভিবাসন, পরিবার পুনর্মিলন, শিক্ষার্থী ভিসা, কাজের ভিসা কিংবা বৈধ বসবাসের বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি শক্তিশালী হলে প্রথম প্রভাব পড়তে পারে নতুন অভিবাসীদের ওপর। ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর হতে পারে, পারিবারিক পুনর্মিলন আরও কঠিন হতে পারে এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর নামে বৈধ অভিবাসীদের ওপরও প্রশাসনিক যাচাই বাড়তে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো সামাজিক পরিবেশ।
কট্টর অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য যদি নিয়মিত রাজনৈতিক ভাষণে পরিণত হয়, তাহলে বৈধ অভিবাসী ও দীর্ঘদিনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও কখনো কখনো সন্দেহ, অপমান বা বৈষম্যের মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে অভিবাসী ও বর্ণগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় তৈরির বিষয়টি অধিকারকর্মীরাও তুলে ধরেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা
তবে যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় আগমন এ বছর ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে বলে সরকার জানিয়েছে। Reuters-এর হিসাবে এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার মানুষ ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে এসেছে। অর্থাৎ অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ বাড়লেও ছোট নৌকায় আগমন একই হারে বাড়ছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
সমস্যাটি তাই শুধু অভিবাসীর সংখ্যা নয়; অভিবাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে রাজনৈতিকভাবে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই এখন ইউরোপের বড় প্রশ্ন।
সামনে কী হতে পারে?
আগামী দিনে ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে রাজনীতি আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে থাকা দেশগুলোতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ, ফেরত পাঠানো এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে থাকবে।
কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে—কঠোর সীমান্তনীতি এবং বৈধ অভিবাসীদের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা যায়।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার: ইউরোপে রাজনৈতিক পরিবেশ বদলাচ্ছে। তাই নতুন করে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের ভিসা, কাজের অনুমতি, আবাসন, পরিবার পুনর্মিলন এবং স্থায়ী বসবাসের নিয়ম সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির ঢেউ হয়তো আজ মূলত ছোট নৌকা নিয়ে আলোচনা করছে; কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রভাব আগামী দিনের বৈধ অভিবাসন নীতিতেও পৌঁছাতে পারে।