বাংলাদেশ সংবাদ
LDC উত্তরণ পেছাতে বাংলাদেশের শেষ লড়াই: জাতিসংঘে এখন কূটনৈতিক দৌড়
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৮ সেপ্টেম্বর:
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর সমর্থন আদায়ে শেষ মুহূর্তের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা। আজ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৪ নভেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশের LDC উত্তরণের কথা। তবে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতির সময়সীমা বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন করেছে। জাতিসংঘের Committee for Development Policy (CDP) এই আবেদনের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে এবং জুলাইয়ে ECOSOC সাধারণ পরিষদকে বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে।
এখন সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—CDP ও ECOSOC-এর ইতিবাচক অবস্থান থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আজকের The Daily Star জানিয়েছে, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ তাদের তিন বছরের সময় বাড়ানোর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে চাইছে।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনকেও বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে জাতীয় Graduation Monitoring and Coordination Committee-এর বৈঠকও হয়েছে।
কেন পিছিয়ে দিতে চাইছে ঢাকা?
LDC থেকে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি বড় অর্জন। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার মনে করছে, আরও তিন বছর প্রস্তুতির সময় পাওয়া গেলে উত্তরণের ঝুঁকি কিছুটা সামলানো সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের CDP-ও বলেছে, অতিরিক্ত সময় দেওয়া যেতে পারে—তবে শর্ত হলো, এই সময়ে বাংলাদেশকে দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সংস্কার করতে হবে।
অর্থাৎ, তিন বছর সময় পাওয়া মানেই শুধু LDC সুবিধা ধরে রাখা নয়; এই সময়কে অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজে ব্যবহার করতে হবে।
সবচেয়ে বড় ভয় রপ্তানি নিয়ে
LDC উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারাবে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানিতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে।
UNCTAD-এর একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, LDC সুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রপ্তানি ক্ষতি ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এটি সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব, নিশ্চিত ক্ষতির পরিমাণ নয়।
তাই ইউরোপসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখা, নতুন বাণিজ্যচুক্তি করা এবং বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিন বছর পেলেই কি সংকট কাটবে?
না—এটাই আসল প্রশ্ন।
বাংলাদেশ যদি ২০২৯ পর্যন্ত সময় পায়, তাহলে সেই সময়ের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় নতুন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে ২০২৯ পর্যন্ত একটি সংস্কার রোডম্যাপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার ও লজিস্টিকস উন্নয়নের মতো লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
সুতরাং LDC উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন সফল হলেও আসল পরীক্ষা শুরু হবে তার পরেই।
প্রবাসীদের জন্য এর গুরুত্ব কোথায়?
যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিপণ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে।
এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবারেও। কারণ দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দুর্বল হলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে; আবার রপ্তানি খাত শক্তিশালী থাকলে দেশের আয় ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি তুলনামূলক শক্ত থাকবে।
তাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা পরিবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা নয়। এটি বাংলাদেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে আরও তিন বছর প্রস্তুত করার সুযোগ আদায়ের লড়াই।