ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ধীরগতি: আটকে আছে সিলেটের শিল্প-বাণিজ্যের গতি

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ধীরগতি: আটকে আছে সিলেটের শিল্প-বাণিজ্যের গতি

সিলেট প্রতিনিধি:

সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও চা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ যোগাযোগ করিডোরটি আধুনিকায়নের স্বপ্ন দেখেছিল ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু দীর্ঘদিনের বেহাল অবস্থা এবং চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সেই সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি মহাসড়কের সংকট এখন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। বাড়ছে পণ্য পরিবহন ব্যয়, দীর্ঘ হচ্ছে সরবরাহ সময়, কমছে পর্যটন খাতের করপোরেট গ্রাহক এবং ক্ষতির মুখে পড়ছে চা শিল্প।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় গর্তে পানি জমে যান চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই পণ্যবাহী ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে কিংবা গর্তে আটকে যায়। এতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।

সর্বশেষ ভারি বৃষ্টির পর মহাসড়কের ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়। যে পথ পাড়ি দিতে সাধারণত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লাগার কথা, সেখানে এখন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও সময় লাগছে। এতে যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প-কারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্প করিডোরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

গত দুই দশকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ঘিরে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে হবিগঞ্জ সদর পর্যন্ত প্রায় ৫২ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি বড় শিল্প করিডোর। গ্যাস ও বিদ্যুতের সহজপ্রাপ্যতা এবং রাজধানীর সঙ্গে তুলনামূলক কম দূরত্বের কারণে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলো।

হবিগঞ্জের অলিপুর শিল্পাঞ্চলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় কারখানা রয়েছে। প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। কিন্তু মহাসড়কের দুরবস্থার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়ক উন্নয়ন দ্রুত শেষ না হলে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বিদ্যমান শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা বলেন, দীর্ঘ যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে বেকারিজাত পণ্য সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সমস্যার কারণে সিলেটগামী ট্রাকের ভাড়া অন্যান্য রুটের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং উৎপাদন খরচেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চা শিল্পেও পড়েছে প্রভাব

সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মহাসড়কের দুরবস্থায়। শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও উৎপাদিত চা নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা দেশের অন্য অঞ্চলে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আগে যেখানে একটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সাত দিন সময় লাগত, এখন সেখানে ১৩ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। ফলে গুদাম ও বন্দরে পণ্যের জট তৈরি হচ্ছে এবং বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যয়।

পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব

সিলেটের পর্যটন শিল্পও যোগাযোগ সংকটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সড়কযাত্রার কারণে অনেক পর্যটক বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।

হবিগঞ্জের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, মহাসড়কের সমস্যার প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে রেল, পর্যটন ও চা শিল্পে।

তার মতে, করপোরেট গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এখন সিলেটের পরিবর্তে গাজীপুর বা নরসিংদীর মতো কাছাকাছি পর্যটন এলাকায় যাচ্ছেন। এতে সিলেটের হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায় আয় কমছে।

আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক শুধু দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক করিডোর নয়, এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সম্ভাব্য আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেও বিবেচিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই করিডোর আধুনিক না হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগও সীমিত থাকবে।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, মহাসড়কের দুরবস্থা সিলেট অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পর্যটন, ব্যবসা ও শিল্পায়ন প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।

চার লেন প্রকল্পে ধীরগতি

ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৯ কিলোমিটারের বেশি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।

প্রকল্পের আওতায় চার লেনের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস লেন, ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, সাতটি ফ্লাইওভার, ছয়টি রেলওয়ে ওভারব্রিজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো খুব ধীর। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কাজের অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন এবং নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের গতি কমেছে।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান জানান, সাত জেলায় প্রায় ৮২৯ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলেও এখনো বড় অংশের জমি প্রকল্পের আওতায় আসেনি। প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দ্রুত আধুনিকায়ন হলে শুধু সিলেট নয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিল্প, পর্যটন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। অন্যথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন অপ্রকাশিতই থেকে যাবে।