ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৭ ।। মামলা পাঁচ কোটি টাকা !
মামলা পাঁচ কোটি টাকা !
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।
উৎসর্গ:
ফুটবলকে ভালোবাসেন, কিন্তু ফুটবলের আবেগে মানুষকে ভুলে যান না—সকল সুস্থ সমর্থকের প্রতি

নোয়াখালীর সুধারাম থানা। থানার পুলিশ কর্মকর্তা অফিসে একমনে ফাইল দেখছেন। তাকে বেশ ব্যস্ত মনে হচ্ছে। একটু পরেই ফেনসিডিলের একটা চালান ধরতে ফোর্স নিয়ে বাইরে বেরুতে হবে। ঠিক এই সময়টায় হন্তদন্ত হয়ে এক যুবকের প্রবেশ। সে হাঁপাতে হাঁপাতে জানায়, তার একটা অভিযোগ আছে।
অভিযোগকারী যুবকের হাতে মোটা একটি ফাইল। চোখেমুখে দৃঢ়তা। বয়স তেইশ/চব্বিশ হবে। মনে হচ্ছে, সে কোনো বড় দুর্নীতির রহস্য উন্মোচন করতে এসেছে।
ডিউটি অফিসার ফাইল খুলে প্রথম লাইন পড়েই একটু থমকে গেলেন।
অভিযোগের আসামি—ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের বিরুদ্ধে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি।
অভিযোগের বিষয়—বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচে মিসরের পরাজয় ও রেফারিংয়ে অনিয়মের অভিযোগ।
ক্ষতিপূরণ দাবি—পাঁচ কোটি টাকা।
যুবকটিকে একটু ঠান্ডা করে অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন অফিসার। তাই বিষয়টি হালকা করার জন্য জানতে চান।
—মিশরের ইংরেজি নাম কি?
— দেশের নাম আবার ইংরেজি হয় নাকি?
— হয়। পৃথিবীতে দুটি দেশের নাম আমরা ইংরেজি ও বাংলাতে বলি। যেমন মিশরের ইংরেজি নাম ‘ইজিপ্ট’ আর ভারতের ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়া’। যুবকটি কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে থাকে মাথা নিচু করে।
পুলিশ কর্মকর্তা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞেস করেন,
— মিশর পরাজিত হওয়ায় আপনার কী ক্ষতি হয়েছে?
যুবক বলল,
—মানসিক ক্ষতি হয়েছে। ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচটি দেখার পর থেকে আমিসহ আমার অভিযোগের সাক্ষীরা চরমভাবে ভেঙে পড়েছি। এই অন্যায়ের বিচার হওয়া উচিত। আমার দলবল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
পুলিশ কর্মকর্তা বললেন,
—ডাক্তার দেখিয়েছেন?
কাছে বসা সহকারীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে অফিসার বলেন, আজকাল পাগল-ছাগলে ভরে গেছে দেশটা ! আফসোস !
যুবক রেগে যায়। বলে,
—আমি কি পাগল? আমি ডাক্তার দেখাবো কেন? আমি ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছি। বিচার চাই।
— পুলিশ অফিসার একটু স্মিত হেসে জবাব দেন,
— আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? ‘আপনি ছাড়া’ কি এ দেশে আর কোন পাগল-ছাগল নেই?
অফিসারের কথা শুনে যুবকটি শান্তনা পায়। সত্যিই তো, সে কেন পাগল হতে যাবে? আজকাল আসলেই তো দেশে পাগল ছাগলের অভাব নেই। নিজেকে সামলে বলে,
— স্যার আমার অভিযোগটি যদি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন তাহলে অনেক উপকার হয়।
— আপনার নাম, ঠিকানা বলেন,
— নাম ‘হচ্ছে’ মো: রকিব উদ্দিন। বাড়ি ‘হচ্ছে’ মাদারবাড়ি। ইউনিয়ন ‘হচ্ছে’ মান্দারুকা।
একটা কাগজে নাম ঠিকানা লিখে অফিসার জানান,
— আচ্ছা, এখন ‘হচ্ছে’, দেখছি, আপনার জন্য কি করা যায়। সব লিখে রাখলাম। আপনি এখন ‘হচ্ছে’, বাড়ি যান।
—আমার অভিযোগ নিয়ে কাজ ‘হচ্ছে’ তো? যুবকটি জানতে চায়।
—এই তো লিখেছি। ‘হচ্ছে’, হ্যাঁ আপনাদের মতো তরুণদেরই তো আজকাল ‘সব হচ্ছে’।
যুবকটি থানা থেকে বেরিয়ে পড়ে। বাইরে অপেক্ষা করছে ওর বন্ধুরা।

এইসব যুবকদের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়। ফুটবল মানে আবেগ, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান—সব মিলিয়ে এক ধরনের ধর্ম।
নিজের দেশের ফুটবল দল কখনো বিশ্বকাপ জিতবে কি না, এই নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দলের হার ওদের রাত জাগিয়ে রাখে।
খেলা চলার সময় সে টিভির সামনে বসে এমনভাবে রেফারির সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে, যেন পৃথিবীর সব ফুটবল আইন তার মুখস্থ।
রেফারি ভুল করলে রকিব বলে,
—এটা শুধু ভুল না, এটা ষড়যন্ত্র!
গোল বাতিল হলে বলে,
—এটা ইতিহাসের অন্যায়!
পেনাল্টি দিলে বলে,
—এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ!
তারপর মোবাইল হাতে নিয়ে ফিফার অফিস কোথায়, আন্তর্জাতিক আদালত কোথায়—সব খুঁজতে বসে যায়।
সুধারাম থানার পুলিশ অবশ্য বুঝতে পারে, আবেগ আর আইনের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।
কারণ ফুটবল মাঠের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ থাকতে পারে, প্রতিবাদ থাকতে পারে, কিন্তু সব অভিযোগ ফৌজদারি মামলা হয় না।
সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে শুরু হয় আলোচনা।
কেউ বলে,
—রকিব একটা পাগল।
কেউ বলে,
—না, সে আসল সমর্থক।
কোণের বেঞ্চে বসে থাকা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মফিজ সাহেব এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
তিনি চা নামিয়ে বললেন,
—পাগল শুধু ওই রকিব না। আমরা সবাই একটু একটু পাগল।
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
তিনি বললেন,
—একটা খেলা নিয়ে মানুষ বন্ধুর সঙ্গে কথা বন্ধ করে, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, রাস্তায় মারামারি করে, বউকে মারে। কখনো কখনো এই উন্মাদনা অপরের প্রাণও কেড়ে নেয়, কখনো নিজেই আত্মহত্যা করে বসে। আর ঐ বিশ্বকাপের ফুটবলাররা কি সুন্দর ম্যাচ শেষ হবার পর, সব ভুলে অপর দলের সবার সাথে হাত মেলায়। আবার অপর দলের অনেকে একে অন্যের ব্যক্তিগত বন্ধুও বটে। এই তো মরক্কো দলের ছয়জন ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে। অথচ ওরা বিশ্বকাপে খেললো নিজ জন্মভূমি ফ্রান্সের বিপক্ষে এবং ওরা দুই গোলে হারলো। তারপর আবার ওদের গলাগলি আর হাত মেলানো। অথচ বাংলাদেশে নিজের সমাজ, নিজের দেশ, নিজের মানুষের সমস্যার জন্য এত আবেগ দেখা যায় না। আমরা অন্য দেশের খেলা নিয়ে রীতিমতো একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করছি বলে মনে হচ্ছে। এদিকে দেশের সমস্যার শেষ নেই। সেদিকে তরুণদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই।
চায়ের দোকান কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেল। স্যারের কথা শুনে এখন আর কারো মুখে কোন কথা নেই। মনে হলো ওরা কিছুটা বুঝতে পেরেছে যে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে এত মারামারির কিছু নেই।
বাইরে বাতাসে উড়ছিল একটি বিদেশি দলের পতাকা।
পাশেই পড়ে ছিল বাংলাদেশের পতাকা।
সবার প্রিয় ‘চৌধুরী চাচা’ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পতাকাটি তুলে পরিষ্কার করে দোকানের সামনে টাঙিয়ে দিলেন।
বললেন,
—খেলাকে ভালোবাসুন, কিন্তু খেলার চেয়েও মানুষকে বেশি ভালোবাসুন।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু দূরে কোথাও একটা বাঁশির শব্দ শোনা গেল।
মনে হলো, সেটি কোনো রেফারির বাঁশি নয়।
সেটি যেন বিবেকের বাঁশি।
লন্ডন, ১০ জুলাই ২০২৬।