কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩৮ ।।

শুরু হয়েছে পঞ্চপান্ডবের টানাটানি: দাবার চালের অপেক্ষায় দিন গুনি

শুরু হয়েছে পঞ্চপান্ডবের টানাটানি: দাবার চালের অপেক্ষায় দিন গুনি

উৎসর্গ
বড় শক্তির টানাটানির মাঝেও নিজের পথ খুঁজে নেওয়া বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের জন্য

পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। নদী, মাটি আর মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এ দেশের পরিচয় যেমন গভীর, তেমনি এর ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পুরো দক্ষিণ দিকজুড়ে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর—যে সাগর আজ আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

বাংলাদেশের রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। রয়েছে বিশাল উপকূলীয় এলাকা, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান। ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

এক সময় যে বঙ্গোপসাগরকে শুধু বাণিজ্য ও জীবিকার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হতো, আজ সেখানে চলছে বিশ্বশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত—তিন বৃহৎ শক্তির পাশাপাশি রাশিয়া, জাপান। এছাড়াও আঞ্চলিক শক্তি পাকিস্তান ও তুরস্কও নিজেদের স্বার্থের হিসাব কষছে। আর ঐ পঞ্চপান্ডদের সেই টানাপোড়েনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব কেন এত বেশি?

চীনের জন্য বঙ্গোপসাগর একটি কৌশলগত দরজা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা। কোনো সংঘাতের সময় এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। এটিই চীনের ‘মালাক্কা ডিলেমা’।

এই কারণে চীন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। মিয়ানমারের কিয়াকপিউ বন্দর, পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

অন্যদিকে ভারত বঙ্গোপসাগরকে নিজের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌ তৎপরতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত চীনের প্রভাব মোকাবিলার একটি অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রও চায় এই অঞ্চলে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক ব্যবস্থা বজায় রাখতে। ফলে বাংলাদেশ, যার রয়েছে দীর্ঘ উপকূল, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর এবং ভৌগোলিক অবস্থান—সে হয়ে উঠেছে সবার আগ্রহের কেন্দ্র।

বাংলাদেশের ভারসাম্যের পরীক্ষা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ছিল—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এই নীতি পালন করা আগের চেয়ে কঠিন।

চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ভূমিকা রয়েছে।

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। ইতিহাস, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের দিক থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর একটি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি প্রভাবশালী শক্তি।

এই তিন শক্তির স্বার্থ যখন একই ভূখণ্ডে এসে মিলিত হয়, তখন বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ থাকে না।

পাকিস্তান-তুরস্ক: নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

দক্ষিণ এশিয়ার আরেক পুরনো খেলোয়াড় পাকিস্তানও নতুনভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সামরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে পাকিস্তান নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়।

তুরস্কও গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজির হয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।

পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্পর্ক এখন শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ নয়; এটি সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সমর্থন—সবকিছুই এই সম্পর্ককে গভীর করছে।

তবে এখানেও রয়েছে হিসাব-নিকাশ। তুরস্ক একদিকে ন্যাটোর সদস্য, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

এই জটিল সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

পাঁচ শক্তির টানাটানি

বাংলাদেশকে ঘিরে বর্তমান ভূরাজনীতিকে অনেকটা পাঁচ শক্তির টানাটানি বলা যায়—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক।

তবে এই তালিকায় রাশিয়া, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকাও উপেক্ষা করার মতো নয়।

প্রতিটি দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়, কিন্তু প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব স্বার্থ।

কেউ চায় বন্দর ও বাণিজ্য সুবিধা, কেউ চায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, কেউ চায় রাজনৈতিক প্রভাব।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে একটি স্বাধীন ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি।

সেন্ট মার্টিন থেকে সমুদ্রসীমা: কৌশলগত বাস্তবতা

বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, উপকূলীয় অঞ্চল এবং সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ নতুন নয়। কারণ ছোট একটি ভূখণ্ডও কখনো কখনো বড় শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সম্পদ হয়ে ওঠে।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলে, বড় শক্তিগুলো যখন কোনো অঞ্চলে প্রতিযোগিতায় নামে, তখন ছোট দেশগুলোর সামনে যেমন সুযোগ আসে, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি হয়।

দাবার চালের অপেক্ষায় দিন গুনি !

আগামী দশকে বঙ্গোপসাগর হয়তো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সংঘাত মানেই যুদ্ধ নয়। প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো এক পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। এখন বাংলাদেশ এই ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় কি চাল দেয় এবং ঐ পঞ্চপান্ডবের দল কোন চাল খেলে, সেটাই আমাদের সাধারণ জনগনের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কি করার আছে?

দেশের এ অবস্থার মধ্যেও দেখছি, জনগনের কেউ কেউ  বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য একে অপরকে বুকে ছুরি বসাতে ব্যস্ত। কেউ কেউ আত্মহত্যা করছে। আবার অনেকে কারো অন্ডকোষ চেপে ধরে চাঁদা আদায় করছে। কেউ কেউ দলবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে একে অপরকে নিজেই বিচার করছে। যে যেভাবে পারছে দুর্নীতি করেই চলেছে। আর পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়েই যাচ্ছে দেদারসে। সম্প্রতি প্রকাশিত হলো, বিশ্বে বাসযোগ্য রাজধানীর মধ্যে ঢাকার অবস্থান মন্দের দিক দিয়ে তৃতীয়। তারপরও রাজধানীকে বসবাসের অনুপযোগী করার প্রতিযোগিতা চলছে সমানে। সরকার প্রধান প্রতিদিনই জনগনকে সচেতন করেই চলেছেন। কিন্তু জনগন শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর এই টানাটানিতে দেশের অবস্থা বেহাল।

ইতিহাস বলে, বড় শক্তির বন্ধুত্ব অনেক সময় স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আজ যারা বন্ধু, আগামীকাল তারা নিজেদের স্বার্থে অবস্থান বদলাতেও পারে। তাই বঙ্গোপসাগরের এই নতুন দাবার বোর্ডে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রয়োজন সতর্ক কূটনীতি, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

নইলে সত্যিই প্রশ্ন থেকে যাবে—

দেশ নিয়ে পঞ্চপান্ডবের এই টানাটানিতে, কখন কী হয়—তা সময়ই হয়তো বলে দেবে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, গল্পকার, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১০ জুলাই ২০২৬