নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৬ ।। আষাঢ়ের কদম ফুল

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৬ ।। আষাঢ়ের কদম ফুল

।। আষাঢ়ের কদম ফুল।। 

 

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ

সেই ছোট্ট বন্ধুটির জন্য, যে বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে চলে গেছে জীবনের অন্য কোনো নদীতে

বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ পাতাল বৃষ্টি।

এমনভাবে হচ্ছে, যেন আকাশের কোথাও একটা পুরোনো কল খুলে রেখে কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে।

আরিফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। চায়ের চেয়ে ধোঁয়া বেশি। ধোঁয়ার চেয়ে স্মৃতি বেশি।

মোবাইল ফোনটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।

— "বৃষ্টি দেখছেন?"

অচেনা নম্বর।

আরিফ লিখে, "হ্যাঁ।"

ওপাশে উত্তর আসে, "আমিও।"

এই "আমিও" শব্দটা অদ্ভুত। পৃথিবীতে কত মানুষ বৃষ্টি দেখে! কিন্তু একজন অচেনা মানুষ যখন বলে "আমিও", তখন মনে হয় বৃষ্টি দুজনের যৌথ সম্পত্তি।

আরিফ আর কোনো উত্তর দেয় না।

কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ।

— "ভুল নম্বরে চলে এসেছে। বিরক্ত করলাম?"

— "না।"

— "তাহলে পাঁচ মিনিট গল্প করা যায়?"

আরিফ নিজের অজান্তেই হেসে ফেলে।

বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেলে মানুষ আর নতুন গল্পে বিশ্বাস করে না। তবু বৃষ্টি হলে বয়স একটু কমে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শোনার জন্য বাড়ির এক পাশে আলাদা টিনের চাল দিয়ে ছোট্ট ঘরটি বানিয়েছে  আরিফ।

ওপাশের মেয়েটির নাম নীলা।

সে বলে, তার ছোটবেলায় বৃষ্টি নামলেই বাবা বাজার থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরতেন। নিজের জন্য কখনো নতুন জামা কিনতেন না, কিন্তু মেয়ের জন্য কদম ফুল কিনতে ভুলতেন না।

আরিফ বলে, "আমার মা বৃষ্টির রাতে জানালার পাশে বসে ভেজা চুল মুছতেন। সেই গন্ধ আজও ভুলিনি।"

নীলা দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর আস্তে বলে, "মায়ের গন্ধ আর ভেজা মাটির গন্ধ... দুটোই বোধহয় আল্লাহ একই রঙে বানিয়েছেন।"

আরিফ অবাক হয়।

কেউ এত সুন্দর কথা কীভাবে বলে?

...   ...   ...

সেই ভুল নম্বরের গল্প শেষ হয় না।

প্রতিবার বৃষ্টি হলেই তাদের কথা হয়।

রোদ উঠলে নয়।

শীতের কুয়াশাতেও নয়।

শুধু বৃষ্টি।

তারা দুজন দুজনকে কখনো ছবি পাঠায় না।

ভিডিও কলও করে না।

মনে হয়, মুখ দেখে ফেললে জাদু ভেঙে যাবে।

... ...   ...

একদিন নীলা বলে,

— "জানেন, আমি কদম ফুল খুব ভালোবাসি।"

— "আমি কিনে দেব।"

— "কোথায়?"

— "যেদিন দেখা হবে।"

নীলা হেসে বলে,

— "দেখা হলে আর কদম ফুলের দরকার হবে না।"

... ...  ...

দেড় বছর কেটে যায়।

এক বর্ষার সকালে তারা দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্থান—একটা ছোট রেলস্টেশন।

সময়ের আগেই আরিফ পৌঁছে যায়।

হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল।

বৃষ্টি হচ্ছে।

প্ল্যাটফর্মে মাত্র তিনজন মানুষ।

একজন চা বিক্রেতা।

একজন বৃদ্ধ।

আর একজন ছোট ছেলে, বৃষ্টিতে ভিজে কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে।

আরিফ অপেক্ষা করে।

এক ঘণ্টা।

দুই ঘণ্টা।

তিন ঘণ্টা।

নীলা আসে না।

ফোন বন্ধ।

মেসেজের উত্তর নেই।

বৃষ্টি থামে।

আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়।

কদম ফুলগুলো ধীরে ধীরে নুয়ে পড়ে।

...  ...  ...

ছয় মাস পর ঋতুচক্রের খেলায় আবার ধরণীতে বর্ষা নামে।

মেঘলা আকাশ। আজও বৃষ্টি এসেছে ঐ প্রথম পরিচয়ের দিনের মতো আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে। ঠিক তক্ষুনি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে।

ওপাশে এক তরুণীর কণ্ঠ।

— "আপনি কি আরিফ?"

— "জি।"

— "আমি নীলার ছোট খালা মনিকা।"

আরিফের বুকটা কেঁপে ওঠে ছেৎ করে।

মনিকা বলেন,

"নীলার ক্যানসার ছিল। আপনাকে বলেনি। নীলা বলতো, আপনি জানলে কষ্ট পাবেন। যেদিন দেখা করার কথা ছিল, সেদিন ও হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমি ওর বয়সী । আমরা বান্ধবীর মতো। আমি সব সময় ওর সাথেই ছিলাম হাসপাতালে। শেষ রাতে শুধু একটা কথাই বলেছিল—'ছোটখালা, বৃষ্টি হলে উনি যেন কদম ফুল কিনতে ভুলে না যান।'"

ফোন কেটে যায়।

... ... ...

সেই থেকে প্রতি আষাঢ়ে আরিফ কদম ফুল কেনে।

কাউকে দেয় না।

বাড়ির বারান্দায় রেখে দেয়।

বৃষ্টি এসে ফুলগুলো ভিজিয়ে দেয়।

মাঝে মাঝে তার মনে হয়, বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর একজন নীলা লুকিয়ে আছে।

সে হেসে বলেছিল..

"দেখা হলে আর কদম ফুলের দরকার হবে না..."

আরিফ তখন আস্তে করে উত্তর দেয়,

"দেখা তো হচ্ছেই, নীলা। তুমি বৃষ্টির মধ্যে আছো। আমি শুধু ভিজতে শিখেছি।"

তারপর সে হাত বাড়িয়ে দেয় বৃষ্টির দিকে।

বৃষ্টি হাত ভরে নেয় আরিফ।

আর আষাঢ়ের সোঁদা গন্ধে পৃথিবীটা আবার নীলাময় মনে হয়।

 

লন্ডন, ৯ জুলাই ২০২৬।