ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি: টিকাদান ঘাটতিতে বাড়ছে শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১১ সেপ্টেম্বর:
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বড় স্বাস্থ্যসংবাদে পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা প্রাদুর্ভাবকে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলমান হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংকটে বুধবার পর্যন্ত হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ১,০০২-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় হাম হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে, আর ৯০২টি মৃত্যু সন্দেহভাজন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জন হাম বা হামসদৃশ সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই ১,১৮৮টি নতুন আক্রান্ত এবং ১,০৩৪ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজারে পৌঁছেছে।

রয়টার্স কী লিখেছে ?
Reuters ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে তুলে ধরে। তাদের প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত মৃত্যু ছিল ৯৯৯, সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্ত প্রায় ১৯,৮৩৫ জন।
Reuters-এর প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা বর্তমান সংকটের পেছনে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং টিকা সরবরাহের সমস্যাকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ২০২৪ সালের একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যায় এবং পরের বছর জাতীয় হাম-রুবেলা অভিযান বাতিল হয়। পরবর্তী সময়ে টিকা সংগ্রহের নীতিতেও পরিবর্তন আসে। এর ফলে অনেক শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।
Reuters আরও জানিয়েছে, বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তারা নিয়মিত হাম টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।
Associated Press কী বলেছে ?
Associated Press (AP) একটি আট মাসের শিশু রোজাতুন জান্নাত রামিসার চিকিৎসার ঘটনা দিয়ে প্রতিবেদন শুরু করেছে। শিশুটি ঢাকার হাসপাতালে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল এবং তার মা দূরবর্তী এলাকা থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন।
AP বলছে, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতার সঙ্গে বর্তমান সংকটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাদের হিসাবে ২০২৫ সালে শিশুদের হাম টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার হার প্রায় ৮৬ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ।
AP আরও বলেছে, হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া প্রয়োজন। এই মাত্রার সুরক্ষা না থাকলে যেসব শিশু বয়সের কারণে এখনো টিকা নিতে পারে না, তারাও ঝুঁকিতে পড়ে।
Washington Post-এর প্রতিবেদনে কী এসেছে ?
The Washington Post-এ প্রকাশিত AP-এর প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল—বাংলাদেশে হাম আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংগ্রাম।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ার পর ২০২৪ সালে আরেকটি বড় টিকাদান কর্মসূচি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। ফলে কয়েক বছর বয়সী অনেক শিশু টিকার প্রয়োজনীয় ডোজ পায়নি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ আতিউল ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরে পত্রিকাটি জানিয়েছে, মহামারির সময় অনেক পরিবার শিশুদের টিকা দিতে পারেনি। পরে কিছু টিকাকেন্দ্রে টিকা না পাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এর ফলে ধীরে ধীরে একটি ‘immunity gap’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক তৈরি হয়।
হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Al Jazeera কী বলেছে ?
Al Jazeera আরও সাম্প্রতিক DGHS তথ্য ব্যবহার করে খবরটির শিরোনাম করেছে—“Bangladesh measles deaths surpass 1,000 after vaccination drive falls short”।
তাদের প্রতিবেদনে মৃত্যুর সংখ্যা ১,০০২ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ বলা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো—এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও প্রায় ৪০ লাখ শিশু কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে গেছে।
DGHS-এর একজন মুখপাত্রের বক্তব্যও তারা তুলে ধরেছে—দেশে এখনো প্রয়োজনীয় herd immunity বা জনগোষ্ঠীগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর বক্তব্য
UNICEF বলেছে, বাংলাদেশে হাম ঠেকাতে দুই ডোজ টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। সামান্য টিকাদান ঘাটতিও সময়ের সঙ্গে বড় immunity gap তৈরি করতে পারে।
UNICEF-এর এপ্রিলের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, তখন শনাক্ত হাম আক্রান্তদের মধ্যে ৭২ শতাংশ কোনো হাম টিকাই পায়নি এবং আরও ১৬ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত ছিল। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছিল; মোট আক্রান্তের প্রায় ৮১ শতাংশ ছিল এই বয়সী।
কেন এত বড় সংকট?
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বছরে হাম আক্রান্তের সংখ্যা সাধারণত ১০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে ছিল। ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৪১০। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচিতে ধারাবাহিক ব্যাঘাতের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, টিকা সরবরাহ এবং শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোর দুর্বলতারও প্রকাশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা—ডেঙ্গু। Reuters জানিয়েছে, চলতি বছর ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ফলে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলো চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে এবং প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো একই জায়গায় এসে মিলছে—জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামলানো গেলেও নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থা পুরোপুরি শক্তিশালী না হলে ঝুঁকি থেকে যাবে।
হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। তাই প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্যসংকটের পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রশ্ন তুলছে—যে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেই রোগে এত শিশুর মৃত্যু কেন হলো?
ভয়েস অব পিপল-এর দৃষ্টিতে, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু চিকিৎসাব্যবস্থায় নয়; টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, টিকা সরবরাহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা সুরক্ষিত ছিল—সবকিছুর মধ্যেই খুঁজতে হবে।