আল হাদিস নয় বরং জাল হাদিস
আল হাদিস নয়
বরং জাল হাদিস
।।. সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
ইসলামী জ্ঞানের মূল উৎস হলো কোরআন ও সহিহ হাদিস। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা অজ্ঞতার কারণে বহু জাল হাদিস তৈরি হয়েছে। এই জাল হাদিসগুলো মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, ভুল আকীদা গড়ে তুলেছে, এমনকি বহু যুগ ধরে ইসলামের প্রকৃত চেহারাকে আড়াল করেছে।
অত্যন্ত বিনীতভাবে জানাচ্ছি—আমি মাদ্রাসা লাইনের ছাত্র নই। আমার একাডেমিক পড়াশোনা সাধারণ লাইনের। তবে জানার আগ্রহে এবং নিজের সখের বশে বিভিন্ন সময়ে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার ফলশ্রুতিতে আজকের এই কলাম সিরিজের জন্ম। পাশাপাশি ‘কলিকালের কলধ্বনি’ও চলবে।
দেশে এবং বিলাতেও দেখছি, অনেক তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত মানুষজন ভুল হাদিস নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অযথা তর্ক করে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। আবার কেউ কেউ কোরানের বাণীকে, হাদিসের বাণী বলে চালিয়ে দেন। অনেক শিক্ষিত লোক বলেন, আমি অমুকের কাছে শুনেছি। কিন্তু ঐ অমুক যে ভুল বলেছে সেটা আর যাচাই করেন না। সম্প্রতি এরকম এক পুরানো শিক্ষিত বন্ধু আলাপকালে বলে উঠলেন, জ্ঞানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে তোমরা চীন দেশে পর্যন্ত যাও’। অতচ এটা কোরআনে নেই। এমনকি সহি হাদিসেও নেই। ঐ বুটানি বিষয়ে অনার্স পাশ করা ফুটানিবাজ ঐ বন্ধুটিকে অনেক সময় নাশ করেও বুঝাতে সক্ষম হলাম না। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা এটি কোরআনের বাণী।
এই সিরিজে যা লেখা হবে তার কোনকিছু আমার নিজের বানানো নয়। আর একজন মুসলিম হিসাবে তো তা সম্ভব নয়-ই। এসব তথ্য শত শত বছর আগেই বিভিন্ন হাদিস বিশারদগন তুলে ধরেছেন বিভিন্ন গ্রন্থে। আমরা বাপ-দাদা বা হুজুরদের কাছে জন্মের পর থেকে অনেক সহি ও ভুল হাদিস শুনে বড় হয়েছি। যেসব ভুল হাদিস শুনে এসেছি সেগুলো তুলে ধরা হবে এ সিরিজে এবং একজন মুসলিম হিসাবে নিজের গরজে। আমি শুধু শিক্ষিত এবং না জেনে তর্কপ্রিয় বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য একটু খুঁজে খুঁজে তুলে ধরবো। প্রতিটি কলামের তথ্যসূত্র থাকবে। মূলত এটা এক ধরনের গবেষণামূলক কাজ। বলতে নেই লাজ। আশা করি এ কলাম পড়তে পড়ে যাবে সাজ সাজ। ভূমিকা এখানেই শেষ করি আজ।
কেন জাল হাদিস তৈরি হয়েছিল?
হাদিস জালিয়াতির পেছনে কিছু সুস্পষ্ট কারণ ছিল—
১. রাজনৈতিক স্বার্থ: শাসক বা বিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষে মত সৃষ্টি করা।
২. ধর্মে অতিরিক্ত ‘সওয়াব’ যোগ করা: নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দিতে গিয়ে অতিরঞ্জিত কথা বানানো।
৩. ব্যক্তিগত মতবাদ প্রতিষ্ঠা: কোনো বিশেষ ফেরকা বা চিন্তাধারাকে শক্তিশালী দেখানোর জন্য।
৪. গল্প-বলা ও মুখরোচক বয়ান তৈরি করা: লোককে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কল্পিত ঘটনা রচনা।
৫. সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা: আসমানী গল্প ও অলৌকিকতার প্রতি দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া।
কিভাবে জাল হাদিসে মানুষ দ্রুত বিভ্রান্ত হয়?
কারণ বেশিরভাগ জাল হাদিস এমনভাবে সাজানো যে শুনতে অত্যন্ত ‘নরমাল’ ও ধর্মীয় মনে হয়। অনেক সময় অতিরঞ্জিত সওয়াব বা ভয়ের কথা থাকে। যেমন—
-
“এটা করলে এত লাখ সওয়াব…”
-
“এ দোয়া পড়লে সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে…”
এসবের ভাষা ধর্মীয় হলেও যুক্তি ও সহিহ উৎসে নেই।
সহিহ ও জাল হাদিস আলাদা করার সাধারণ মানদণ্ড
ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, হাদিস যাচাইয়ের চারটি প্রধান ভিত্তি হলো—
১. সনদ পরীক্ষা: বর্ণনাকারীরা বিশ্বাসযোগ্য কি না।
২. বর্ণনার ধারা: পুরো বর্ণনাটি সঠিকভাবে সংযুক্ত কি না।
৩. বক্তব্য পরীক্ষা: কোরআন ও সহিহ হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক কি না।
৪. ঐতিহাসিক সত্যতা: ঘটনাটি বাস্তবতার সাথে মেলে কি না।
আজকের পাঠকের জন্য কেন এই সিরিজ জরুরি?
আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়াজ, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপে অগণিত জাল ও দুর্বল হাদিস ছড়িয়ে আছে। এর কারণে—
-
মানুষ ভুল আমল করে
-
ভুল বিশ্বাস গড়ে উঠে
-
ইসলামের সরলতা নষ্ট হয়
-
প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়
আমাদের এই সিরিজের উদ্দেশ্য হলো—সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যার মুখোশ খুলে দেওয়া, একজন দায়িত্বশীল মুসলমান হিসেবে।