আল হাদিস নয়, বরং জাল হাদিস ।। পর্ব -১।। ‘‘জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে চীন দেশে যাও”
আল হাদিস নয়,
বরং জাল হাদিস
পর্ব: ১
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।
বিষয়: “জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে চীন দেশে যাও” — এটি কি আল হাদিস?
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি বাক্য খুব জনপ্রিয়—
“জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে চীন দেশে যাও।”
অনেকেই এটিকে নবীজি (সা.)–এর হাদিস হিসেবে উদ্ধৃত করেন। মসজিদের বক্তৃতা থেকে শুরু করে বইপত্র, এমনকি শিক্ষামূলক লেখায়ও এই বাক্যটি “হাদিস” হিসেবে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এটি সত্যিই হাদিস কি না?
এই পর্বে আমরা যাচাই করব এই বর্ণনার উৎস, সনদের অবস্থা এবং হাদিসবিদদের মতামত।
বাণীটির উৎস কোথায়?
প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
এই বর্ণনাটি কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে নেই।
বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আহমদ— কোথাও এটি পাওয়া যায় না। এমনকি কম পরিচিত অনেক সংগ্রহেও এর সঠিক সনদ খুঁজে পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, এর কোনো স্বীকৃত সনদ নেই।
মুহাদ্দিসদের রায় কী?
এ বিষয়ে বড় বড় হাদিসবিদগণ স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন:
১. ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, বর্ণনাটি মওজু’, অর্থাৎ জাল।
২. ইমাম জাহাবি (রহ.)— তিনি এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বর্ণনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
৩. ইমাম বায়হাকি (রহ.)— তাঁর মতে, এর সনদ অস্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. সমসাময়িক গবেষকেরাও একে জাল বলে একমত।
অতএব, হাদিস বিজ্ঞান অনুযায়ী এটি হাদিসের মর্যাদা পায় না।
তাহলে বাক্যটি এসেছে কোথা থেকে?
গবেষণায় দেখা যায়, এই বাণীটি মূলত ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাহিত্যিক বা উপদেশমূলক কথাবার্তার মধ্য থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব বোঝাতে এটি জনপ্রিয় হয়ে যায়। পরে সাধারণ মানুষ ভুলভাবে এটিকে “হাদিস” হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
অর্থাৎ, বাক্যটি উপদেশ হতে পারে, কিন্তু তা নবী (সা.)–এর বাণী নয়।
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব কি ইসলাম অস্বীকার করে?
না, বরং ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
কুরআনে প্রথম শব্দ— “ইক্রা” (পড়ো)।
নবীজি (সা.) বলেছেন—
“প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।” (ইবনে মাজাহ – সহিহ সূত্রে আসা ভিন্ন বর্ণনা)
কিন্তু “চীন দেশে যাও”— এই নির্দিষ্ট বাক্যটি ইসলাম থেকে নয়।
কেন জাল হাদিস চেনা জরুরি?
কারণ, জাল হাদিস ধর্মের নামে ভুল ধারণা তৈরি করে, এবং নবীজি (সা.)–এর প্রতি এমন কথা আরোপ করে যা তিনি বলেননি। ইসলাম অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছে—
“যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে জাহান্নামে তার স্থান নিশ্চিত করুক।” (সহিহ বুখারি)
তাই হাদিস বলতে হলে আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা দরকার।
“জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে চীন দেশে যাও”— এটি আল হাদিস নয়। এটি জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা।
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব অবশ্যই ইসলামে রয়েছে, কিন্তু ধর্মের নামে এমন বাক্য প্রচার করা সঠিক নয়। সত্যকে সত্য, আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলা— এটাই আমাদের দায়িত্ব।
সংক্ষেপে
-
“চীন দেশে যাও” — কোনো সহিহ হাদিস নয়।
-
এটি জাল ও ভিত্তিহীন।
-
জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব ইসলামে নিশ্চিত, তবে বাক্যটি নবীজি (সা.)–এর বাণী নয়।
-
হাদিসের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো কথা প্রচার করা ঠিক নয়।
===========
তথ্যসূত্র: “জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার হলে চীন দেশে যাও”
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি — ফাতহুল বারী (شرح صحيح البخاري)
হাদিসের বৈধতা যাচাই ও মওজু’ (জাল) হাদিসের চিহ্নিতকরণ।
ইবনে হাজার স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই বর্ণনা মওজু’।
ইমাম জাহাবি — মিরকাতুস সাঅদাত (المختصر في علم الرجال و الحديث)
বর্ণনাটিকে ভিত্তিহীন (لا أساس له) হিসেবে চিহ্নিত।
ইমাম বায়হাকি — সুন্নানুল কুবরা (السنن الكبرى)
বর্ণনার সনদ অস্বীকৃত এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
ইবনে মাজাহ — সুনান ইবনে মাজাহ
সহিহ সূত্রে এসেছে “প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন ফরজ”।
কিন্তু “চীন দেশে যাও” অংশটি নেই।
সহিহ বুখারি — সাহিহুল বুখারি
নবীজি (সা.)–এর নামে মিথ্যা বলার সতর্কতা উল্লেখ:
“যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে জাহান্নামে তার স্থান নিশ্চিত করুক।”
শায়খ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি — সিলসিলাতুদ দাঈফা
জাল ও দুর্বল হাদিসের বিশ্লেষণ এবং প্রচলিত ভুল বাণীর ব্যাখ্যা।
ইসলামী গবেষণাপত্র ও অনলাইন রেফারেন্স
ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর — জাল হাদিস
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক হাদিস ওয়েবসাইট যেমন: sunnah.com, islamqa.info — এই বাণীটি কোনো সহিহ হাদিসে নেই।