ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশে আগস্টে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম, সাধারণ ভোক্তাদের ছুটছে ঘাম !

বাংলাদেশে আগস্টে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম,  সাধারণ ভোক্তাদের ছুটছে ঘাম !

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১২ আগস্ট: 

আগস্টের শুরু থেকেই দেশের পাইকারি বাজারে একের পর এক প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, মসলা, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় এর প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। ফলে বাজেটে আমদানি পর্যায়ে কর কমানোর পর বাজার কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে গত ৮ থেকে ১০ দিনে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বুকিং মূল্য বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের তীব্রতা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ ঝুঁকির কারণে আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে দেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাবও উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে পড়ছে।

চলতি বছরের জুনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে ও অগ্রিম কর (এআইটি) সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন অস্থিরতা সেই সুবিধার প্রভাবকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে।

পাইকারি বাজারের তথ্য অনুযায়ী, দেড় মাস আগে প্রতি মণ খোলা পাম অয়েল ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৬ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে। সুপার পাম অয়েলের দাম বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। সয়াবিন তেলের দামও প্রায় ১৫০ টাকা বেড়ে প্রতি মণ ৭ হাজার ৪০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

চিনির বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন চাহিদা কম থাকায় প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৪৫০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকার মধ্যে ছিল। এখন তা বেড়ে ৩ হাজার ৬৬০ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে প্রতি মণ চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা।

তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গমের দাম নিয়ে। কয়েক মাস ধরে প্রতি মণ গম ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও গত দুই সপ্তাহে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ টাকায় ওঠে। সর্বশেষ বাজারে প্রতি মণ গম ১ হাজার ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৪৩৫ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

গমের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দার বাজারে। ফ্লাওয়ার মিলগুলো উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে খোলা ও প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দাম কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

https://images.openai.com/static-rsc-4/oDDcczQYETYJqxkTpd_HGrMuEBRvQa9sEESgdKRuOr6TItfOSPpHPIrIvzvGPRaq2LkeIj8W5qK2D8HK1CVbmTrQHGtCmS-XiOfbs2O91vnSkSkzGGJBxCSalShsieKnVR4lvRn9acBQ6LH5o0MYgWj8GjzezHTTJNZD0WKQVt1vTJJAKIYSV_dWyH4VC5aR?purpose=fullsize

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও আটা-ময়দার বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। এক মাসে খোলা সাদা আটার দাম প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে কেজি ৪৫-৫০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, বর্তমানে কেজি ৬০-৬৫ টাকা। খোলা ময়দা প্রায় ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৬০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক বছরের হিসাবও স্বস্তিদায়ক নয়। এ সময়ে খোলা আটার দাম ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, প্যাকেটজাত আটা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং খোলা ময়দা ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে গমের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিয়ে বিশ্বের মোট গমের চাহিদার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। দুই দেশের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে গম রফতানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিকল্প উৎস থেকে গমের বুকিং বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) এসআরডব্লিউ গমের ফিউচার মূল্যও সেই চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বুশেল গমের দাম ৬ দশমিক ৮১ ডলারের কাছাকাছি। সেপ্টেম্বরে সরবরাহযোগ্য গমের দাম ৬ দশমিক ৫৯ ডলার, ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ৭৬ ডলার এবং ২০২৭ সালের মার্চ ও মে মাসের ফিউচার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৯১ ও ৬ দশমিক ৯৮ ডলারে উঠেছে।

আমদানিকারকদের মতে, গমের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, পরিবহন, শিপিং ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষ্ণসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি বাড়ায় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। এর প্রভাব গমের পাশাপাশি ভুট্টা ও ডালের বাজারেও পড়তে পারে।

এদিকে বর্ষা মৌসুমে দেশে শাকসবজি, মাছ ও পোলট্রির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ায় এসব খাদ্যের দামও বাড়ছে। সীমিত আয়ের মানুষ তখন তুলনামূলক কম দামের বিকল্প হিসেবে ডালের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। ফলে ডালের চাহিদা বাড়ায় সেখানেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের সুযোগসন্ধানী আচরণও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। তার মতে, দেশে গম আমদানি হতে কয়েক মাস সময় লাগলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আটা-ময়দার দাম বাড়ানো হয়েছে।

সরকারি পর্যায়েও বিষয়টি নজরে এসেছে। টিসিবি জানিয়েছে, প্রধান ভোগ্যপণ্যের বাজার তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির তথ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম, জাহাজ ভাড়া ও বীমা ব্যয় যদি আরও বাড়ে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গম, তেল, চিনি ও ডালের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ফলে বাজেটে আমদানি পর্যায়ে কর কমানোর পর যে মূল্যস্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও যুদ্ধের প্রভাবে তা এখন আবার অনিশ্চয়তার মুখে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, পাইকারি বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে কতটা ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ের ওপর তার চাপ কতটা বাড়ে।