বাংলাদেশে বন্যা-পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত ৭ জেলা, প্রাণহানি ৫১ ছাড়াল

বাংলাদেশে বন্যা-পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত ৭ জেলা, প্রাণহানি ৫১ ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৩ জুলাই:

টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের সাত জেলার জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, মৌলভীবাজারসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে, কোথাও পাহাড় ধসে বসতভিটা ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও চিকিৎসার সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার দুপুর পর্যন্ত সাত জেলার ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের মানুষ। মোট ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে মারা গেছেন ২৮ জন। চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রামে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ এখনো দুর্যোগের বড় কারণ হয়ে আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুলাই সকাল থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও বৃষ্টি হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বহু গ্রামে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি রয়েছে। অনেক মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলের সুযোগ নেই।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে নলকূপ ও পানির উৎস। ফলে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে। কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে ফসল ও খাদ্যশস্য। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বহু এলাকায় এখনো ঘরের ভেতরে পানি জমে আছে। কোথাও পানি কমলেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরতে পারেনি।

কক্সবাজারে দুর্ভোগ অব্যাহত

কক্সবাজারে কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কাটেনি। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।

এ জেলার দুর্গত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক পরিবার ঘর হারিয়েছে, কৃষিজমি ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেক মানুষ এখনো বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

পাহাড়ি জেলাগুলোতে ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পানি কমতে শুরু করায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। কোথাও গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে, কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে জুমখেত, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত।

অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নতুন করে জীবন শুরু করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামনে আরও বৃষ্টির আশঙ্কা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ওপর।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। পানি নামার পরও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন হবে দীর্ঘ ও কঠিন এক প্রক্রিয়া।