তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু !

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে দুই দফা তাপপ্রবাহে প্রায় ২,৭০০ মানুষের অকাল মৃত্যু !

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে দুই দফা তাপপ্রবাহে প্রায় ২,৭০০ মানুষের অকাল মৃত্যু !

লন্ডন, ১৩ জুলাই: চলতি বছরের মে ও জুনে আঘাত হানা দুই দফা তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াই এই মৃত্যুর বড় কারণ।

গবেষণা অনুযায়ী, জুন মাসের তাপপ্রবাহের সবচেয়ে তীব্র তিন দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় এসব মৃত্যুর ৪০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে, যা মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া ঘটত না।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক ড. ক্লেয়ার বার্নস বলেন, “এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংখ্যা। তাপপ্রবাহ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর প্রাণঘাতী প্রভাব আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”

জুনের তাপপ্রবাহ চলাকালে টানা তিন দিন যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (UKHSA) ও আবহাওয়া দপ্তর (Met Office) সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘রেড ওয়ার্নিং’ জারি করে। সতর্কবার্তায় বলা হয়, এ পরিস্থিতি সবার জন্যই প্রাণঘাতী হতে পারে, তবে বয়স্ক, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী,  অ্যালকোহল ও মাদকসংশ্লিষ্ট কারণে প্রায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। সেই তুলনায় জুনের তাপপ্রবাহের চূড়ান্ত তিন দিনে প্রতিদিনের ৪৪০ মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ২১ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত চলা প্রথম তাপপ্রবাহে প্রায় ৫৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মেট অফিসের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মার্ক ম্যাকার্থি বলেন, ২০২৬ সালের মে ও জুনের তাপপ্রবাহ ছিল মৌসুমের শুরুতেই নজিরবিহীন। মে মাসে পশ্চিম লন্ডনে সর্বোচ্চ ৩৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং জুনে পূর্ব ইংল্যান্ডের ইস্ট অ্যাংলিয়ায় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রিরও বেশি রেকর্ড করা হয়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব তাপপ্রবাহে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা যোগ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে। সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো প্রভাবের কারণে আগামী গ্রীষ্ম আরও উষ্ণ হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।

এর আগে UKHSA জানিয়েছিল, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কমিটিও দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়।

বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জুনের তাপপ্রবাহকে ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তৃত ও তীব্র বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানিতে রেকর্ড ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পাশাপাশি দেশটিতে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো, নেট-জিরো লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কার্যকর জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি আরও বাড়বে।