জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের প্রথম ইসলামিক থিওলজি অনুষদ
জার্মান প্রতিনিধি, ১৩ জুলাই:
ইউরোপের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে জার্মানিতে। দেশটির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইউরোপের প্রথম স্বতন্ত্র ইসলামিক থিওলজি অনুষদ। ধর্মীয় শিক্ষা ও একাডেমিক গবেষণাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার এই উদ্যোগকে ইউরোপে আন্তধর্মীয় বোঝাপড়া ও গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৭ সালে উদ্বোধনের লক্ষ্যে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এ ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইসলামিক থিওলজিসহ বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব বিভাগ একই জায়গায় নিয়ে আসা হবে। ২০২১ সাল থেকে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে এই ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে।
নতুন অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইসলামের একটি উদার, আলোকিত ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা। তার মতে, মুনস্টারের এই উদ্যোগ শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের মুসলিম সমাজেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খোরশিদে। নতুন অনুষদ প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামিক থিওলজি এখন নিজস্বভাবে পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি দিতে পারবে। একই সঙ্গে গবেষণা তহবিল সংগ্রহের সুযোগও বাড়বে।
২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা ইসলামিক থিওলজি কেন্দ্রটি বর্তমানে বড় আকারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে আটজন অধ্যাপকসহ ৫০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন। আগামী কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
জার্মানির সরকারি স্কুলগুলোতে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা চালু হওয়ার পর প্রশিক্ষিত শিক্ষকের চাহিদাও বেড়েছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় প্রায় ৩ হাজার ইসলাম ধর্ম শিক্ষকের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৩৩০ জন।
নতুন অনুষদের অধীনে ‘ইসলাম ও সমাজকর্ম’ নামে একটি স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই কোর্সের মাধ্যমে যুবসেবা, হাসপাতাল, প্রবীণদের সেবা ও সামাজিক খাতে ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অনুষদের নীতিমালায় ইসলাম ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক, কোরআনের সমকালীন ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চরমপন্থা, ইহুদিবিদ্বেষ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান রাখা হয়েছে।
মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ছাদের নিচে খ্রিস্টান ও ইসলামিক থিওলজি নিয়ে কাজ করার উদ্যোগটির প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। এটি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বোঝাপড়া ও সহযোগিতার নতুন পথ তৈরি করতে পারে।
জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই উদ্যোগকে ইউরোপের একাডেমিক ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ সেই চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নতুন সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে পারে।