লন্ডন সংবাদ

ব্রিক লেনের বাঙালি পরিচয় কি হারিয়ে যাবে? ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই

ব্রিক লেনের বাঙালি পরিচয় কি হারিয়ে যাবে? ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :

একসময় জাহাজে করে আসা বাঙালি শ্রমিকেরা যে পূর্ব লন্ডনে নিজেদের নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন, সেই ব্রিক লেন আজ শুধু লন্ডনের একটি রাস্তা নয়—এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাস, সংগ্রাম ও পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। কিন্তু সেই পরিচয় এখন নতুন ধরনের চাপের মুখে।

ব্রিক লেনের সাবেক ট্রুম্যান ব্রুয়ারি এলাকায় বড় একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর বিরোধিতা তীব্র হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন প্রকল্পটি শুধু বাড়িঘর ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, ধীরে ধীরে ব্রিক লেনের ঐতিহাসিক চরিত্র এবং দীর্ঘদিনের বাঙালি কমিউনিটিকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে ট্রুম্যান ব্রুয়ারি পুনর্নির্মাণ প্রকল্প। পরিকল্পনায় ডেটা সেন্টারের পাশাপাশি অফিস, দোকান, রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক ও ইভেন্ট স্পেস এবং ৪৪টি ফ্ল্যাট রাখার কথা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১১টি সাশ্রয়ী মূল্যের এবং ছয়টি সামাজিক আবাসন হিসেবে নির্ধারিত।

এখানেই স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি।

কারণ টাওয়ার হ্যামলেটসে সামাজিক আবাসনের জন্য অপেক্ষমাণ পরিবারের সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। অথচ যে জায়গাটিকে স্থানীয় মানুষ শত শত পরিবারের আবাসনের জন্য ব্যবহার করার দাবি জানিয়েছিল, সেখানে শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি সামাজিক আবাসনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ব্রিক লেনের স্থানীয় কাউন্সিলর ফয়সাল আহমেদ এই এলাকাকে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর নিজের পারিবারিক ইতিহাসও এই রাস্তার সঙ্গে জড়িত—শৈশবে তাঁর পরিবারের রেস্টুরেন্ট ছিল ব্রিক লেনের একটি বাড়ির নিচে।

কিন্তু এখন সেই ব্রিক লেন বদলে যাচ্ছে।

কারি রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি এসেছে পর্যটন, ভিনটেজ দোকান, নতুন ব্যবসা ও রাতভর ব্যাগেল বিক্রির দোকান। বাড়ছে সম্পত্তির মূল্য ও উন্নয়নচাপ। আর তার মাঝেই যুক্ত হচ্ছে এমন একটি অবকাঠামো, যার মূল লক্ষ্য স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা নয়—লন্ডনের দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল অর্থনীতির প্রয়োজন মেটানো।

ডেটা সেন্টারের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন সেবা, আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের যুক্তি, লন্ডনের মতো আর্থিক শহরে দ্রুতগতির ডেটা অবকাঠামো ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোন জায়গায় সেই অবকাঠামো তৈরি হবে এবং তার মূল্য কে দেবে?

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল আগে এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল যাতে প্রায় ৩৫০টি বাড়ি তৈরি হতে পারত। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই স্থানীয় পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে ট্রুম্যান ব্রুয়ারি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়।

এ কারণেই বিষয়টি এখন শুধু একটি ভবন নির্মাণের বিরোধিতা নয়। এটি স্থানীয় গণতন্ত্র বনাম কেন্দ্রীয় উন্নয়ন সিদ্ধান্ত, আবাসন বনাম বাণিজ্যিক অবকাঠামো এবং ঐতিহ্য বনাম দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো—একটি কমিউনিটি শুধু রেস্টুরেন্ট, মসজিদ বা দোকান দিয়ে তৈরি হয় না। একটি কমিউনিটির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাড়ি, পরিবার, স্কুল, কর্মসংস্থান, স্মৃতি, ভাষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের বেড়ে ওঠার পরিবেশ।

ব্রিক লেনের প্রবীণ প্রজন্ম যে জায়গাটিকে নিজেদের ঘর বানিয়েছিল, সেখানে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ভবিষ্যতে থাকতে পারবে কি না—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

কমিউনিটি সংগঠন নিজ্জর মানুশের ড. ফাতিমা রাজিনা বলেছেন, স্থানীয় মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পরিবারগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখা এবং এলাকার ঐতিহ্য রক্ষা করা।

আরেকটি প্রশ্ন পরিবেশ নিয়ে। ডেটা সেন্টার অত্যন্ত বেশি বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করতে পারে। এ কারণেও স্থানীয় পরিবেশবাদীদের আপত্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা আরও দ্বিগুণ হতে পারে।

অর্থাৎ ব্রিক লেনের বিতর্কটি শুধু বাঙালিদের স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি ভবিষ্যতের লন্ডন কেমন হবে—তারও একটি নমুনা।

একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বিশাল অবকাঠামো দরকার। অন্যদিকে লন্ডনে সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট, স্থানীয় মানুষের উচ্ছেদ এবং ঐতিহাসিক এলাকার চরিত্র রক্ষার প্রশ্নও ক্রমেই বড় হচ্ছে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য ব্রিক লেনের প্রশ্ন তাই আরও গভীর।

এই রাস্তার দেয়ালে হয়তো বাংলা লেখা আছে, রেস্টুরেন্টে বাংলা খাবারের গন্ধ আছে, দোকানে বাংলা ভাষা শোনা যায়। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা—এখানে কয়েক প্রজন্মের মানুষের জীবনের গল্প আছে।

উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি একটি কমিউনিটির স্মৃতি, বসবাসের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—শহর কার জন্য উন্নত হচ্ছে?

ব্রিক লেনের লড়াই তাই একটি ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়েও বড়। এটি পূর্ব লন্ডনের বাঙালি ইতিহাস ভবিষ্যতের লন্ডনে কতটা জায়গা পাবে—সেই প্রশ্নের লড়াই।