ব্রিটেন সংবাদ
ব্রিটেনের আকাশে নতুন অশনি সংকেত: MI5-এর ভয়াবহ সতর্কবার্তা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পর ব্রিটেনের নিরাপত্তা নিয়ে নজিরবিহীন সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা MI5-এর প্রধান স্যার কেন ম্যাককালাম। তাঁর ভাষায়, আজকের ব্রিটেন এমন এক নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সন্ত্রাসবাদ এবং শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র—দুই ধরনের হুমকিই একসঙ্গে বাড়ছে।
তবে বিষয়টি শুধু ইসলামপন্থী উগ্রবাদে সীমাবদ্ধ নয়। MI5-এর মূল্যায়নে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং প্রক্সি তৎপরতাও এখন ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ। ম্যাককালাম সতর্ক করেছেন, পরবর্তী বড় ধরনের নিরাপত্তা-ধাক্কা এমন জায়গা থেকেও আসতে পারে, যেদিকে বর্তমানে যথেষ্ট নজর নেই।
সন্ত্রাসের ঝুঁকি এখনো বড়
ব্রিটেনের জাতীয় সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা বর্তমানে ‘Severe’—অর্থাৎ কোনো সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার সম্ভাবনা ‘highly likely’। ১ মে ২০২৬-এ Joint Terrorism Analysis Centre বা JTAC এই মাত্রা ‘Substantial’ থেকে বাড়িয়ে ‘Severe’ করে। MI5 জানিয়েছে, ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদ এখনো দেশের প্রধান সন্ত্রাসী হুমকি; একই সঙ্গে চরম ডানপন্থী সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
MI5-এর ২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের মার্চ থেকে সংস্থা ও পুলিশ যৌথভাবে ৪৩টি শেষ পর্যায়ের সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্র বানচাল করেছে। এসব ষড়যন্ত্রের কিছু ক্ষেত্রে হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের পর্যায়েও পৌঁছে গিয়েছিল।
MI5 আরও জানিয়েছে, তাদের সন্ত্রাসবিরোধী কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ ইসলামপন্থী উগ্রবাদ এবং প্রায় ২৫ শতাংশ চরম ডানপন্থী সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট। তবে হুমকির ধরন বদলে যাচ্ছে—অনেক সন্দেহভাজন ব্যক্তি কোনো সংগঠনের সরাসরি সদস্য নয় এবং অনলাইনে বিচ্ছিন্নভাবে উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হচ্ছে।
অনলাইনে তরুণদের উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়া বড় উদ্বেগ
MI5-এর আগের বার্ষিক মূল্যায়নে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ২৩২টি গ্রেপ্তারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ছিল ১৭ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর। অর্থাৎ উগ্রপন্থার ঝুঁকি শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে অল্প বয়সীদেরও দ্রুত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এ কারণেই ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একসময় সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য, প্রশিক্ষণ ও বিদেশি যোগাযোগ খুঁজে বের করা ছিল প্রধান কাজ। এখন কোনো তরুণ একাই অনলাইনে প্রচারিত ভিডিও, ছবি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা উগ্রবাদী প্রচারণা দেখে সহিংসতার দিকে যেতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান অন্য ছবিও দেখাচ্ছে
সন্ত্রাসবিরোধী Prevent কর্মসূচির সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্দিষ্ট মতাদর্শের উদ্বেগসহ ৮,৭৬৯টি রেফারেলের মধ্যে ২১ শতাংশ বা ১,৭৯৮টি চরম ডানপন্থী উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ইসলামপন্থী উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল ১০ শতাংশ বা ৮৭০টি রেফারেল। আরও ৫৬ শতাংশ বা ৪,৯১৭টি ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ শনাক্ত করা যায়নি।
এই পরিসংখ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রিটেনে সন্ত্রাসের সরকারি আলোচনায় ইসলামপন্থী উগ্রবাদ এখনো প্রধান হুমকি হলেও Prevent-এর সাম্প্রতিক রেফারেল ডেটায় চরম ডানপন্থী উদ্বেগ ইসলামপন্থী উদ্বেগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
অর্থাৎ ব্রিটেনের নিরাপত্তা সংকটকে শুধু একটি ধর্ম বা একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা হিসেবে দেখা বাস্তব পরিস্থিতিকে অসম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে।
ইরানের প্রভাবও ক্রমশ বড় হচ্ছে
MI5 প্রধানের নতুন সতর্কতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হুমকি।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তৎপরতা নিয়ে ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক বছরে ইরানের হয়ে পরিচালিত বা সমর্থিত ২০টির বেশি সম্ভাব্য প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের কথা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব তৎপরতার মধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইরানবিরোধী ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
MI5-এর মতে, বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এখন সরাসরি নিজেদের গোয়েন্দা কর্মকর্তার পাশাপাশি প্রক্সি বা ভাড়াটে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্রিটিশ মাটিতে নাশকতা চালানোর চেষ্টা করছে। জুলাই ২০২৬-এ National Security (State Threats) Act আইনে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে শত্রুভাবাপন্ন কর্মকাণ্ড চালানো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
রাশিয়া ও চীনও নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে
রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু গুপ্তচরবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সাইবার হামলা, নাশকতা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণাকে ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখছে।
চীনের ক্ষেত্রেও MI5-এর উদ্বেগ রয়েছে প্রযুক্তি ও গবেষণা চুরিকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মেধাস্বত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বিদেশি রাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে MI5 প্রকাশ্যে সতর্ক করেছে।
অর্থাৎ নিরাপত্তা এখন শুধু বোমা, বন্দুক বা সন্ত্রাসী হামলার বিষয় নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, একটি প্রযুক্তি কোম্পানির তথ্য, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক কিংবা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার কম্পিউটার ব্যবস্থাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ মুসলিম ও বাংলাদেশিদের জন্য বার্তাটি কী?
MI5-এর এই সতর্কবার্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো—ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের হুমকি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যেন পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা না হয়।
ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সন্ত্রাসবাদ প্রত্যাখ্যান করে এবং সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকের মতোই নিরাপদ সমাজ চায়। একই সঙ্গে Prevent-এর তথ্যও দেখাচ্ছে, ব্রিটেনে উগ্রবাদ শুধু একটি মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চরম ডানপন্থী উগ্রবাদও বড় উদ্বেগের বিষয়।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য তাই সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হলে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় তরুণদের ওপর যেন অযথা সন্দেহ বা বৈষম্য তৈরি না হয়।
দ্বিতীয়ত, কোনো তরুণ অনলাইনে সহিংস উগ্রবাদী প্রচারণার শিকার হলে পরিবার, স্কুল, মসজিদ ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো যেন বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত করতে পারে।
নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার—দুটিকেই একই সঙ্গে রক্ষা করাই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
৯/১১-এর পর বদলে গেছে হুমকির ধরন
২০০১ সালের ৯/১১ হামলার সময় প্রধান ভয় ছিল আল-কায়েদার মতো একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের বড় আকারের পরিকল্পিত হামলা।
২৫ বছর পর পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
আজ একজন ব্যক্তি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য না হয়েও অনলাইনে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত হয়ে হামলা চালাতে পারে। একই সময়ে বিদেশি রাষ্ট্র সাইবার হামলা, গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা কিংবা প্রক্সি ব্যবহার করে ব্রিটেনকে আঘাত করতে পারে।
এই কারণেই MI5 প্রধানের সতর্কবার্তার প্রকৃত তাৎপর্য হলো—ব্রিটেনের সামনে এখন একটি নয়, একাধিক ধরনের নিরাপত্তা সংকট একই সময়ে সক্রিয়।
আর সেই হুমকির মোকাবিলায় শুধু গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ নয়, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদেরও ভূমিকা রয়েছে।
ম্যাককালামের সতর্কবার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং ব্রিটেনকে এমন একটি সমাজ হিসেবে প্রস্তুত করা, যেখানে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রীয় নাশকতা এবং অনলাইন উগ্রবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে—কিন্তু একই সঙ্গে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে না।
কারণ নিরাপত্তা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা জনগণকে রক্ষা করে—জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে না।