ব্রিটেন সংবাদ
যুক্তরাজ্য ভাঙনের নতুন আশঙ্কা: স্বাধীনতার দাবিতে একজোট স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ড
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্ডিফে বৈঠকে বসছে। বৈঠকে তিন দেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ভবিষ্যতে স্বাধীনতা বা সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে যৌথ অবস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববারের এই বৈঠকে স্বাধীনতাপন্থী নেতারা একটি সমঝোতা স্মারক বা Memorandum of Understanding সই করার পরিকল্পনা করেছেন এবং নিজ নিজ দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোটের অধিকার দাবি করবেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন ২০২৬ সালের নির্বাচনগুলোর ফলাফল যুক্তরাজ্যের প্রচলিত রাজনৈতিক মানচিত্রকে বড়ভাবে বদলে দিয়েছে।
চার রাজ্যের মধ্যে তিনটিতেই জাতীয়তাবাদীদের উত্থান

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাজ্যের চার দেশের মধ্যে তিনটিতেই স্বাধীনতাপন্থী বা জাতীয়তাবাদী দল সরকার পরিচালনায় এসেছে বা সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার পথে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ছিল অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, অভিবাসন, শিক্ষা ও আবাসনও।
তবু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ব্যাপ্তি নজিরবিহীন।
স্কটল্যান্ডে SNP ২০২৬ সালের Holyrood নির্বাচনে টানা পঞ্চমবার ক্ষমতায় ফিরেছে। তবে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। স্কটিশ পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬৫টি আসন।
YouGov-এর প্রায় ৪,০০০ স্কটিশ ভোটারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, SNP এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হলেও ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল দলটির ২৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট-শেয়ারের একটি।
অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রশ্নে সমর্থন থাকলেও স্কটল্যান্ডের জনগণ সবাই স্বাধীনতার পক্ষে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
২০১৪ সালের গণভোট এখনো বড় বাধা
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হলো ৫৫ বনাম ৪৫।
২০১৪ সালের গণভোটে ৫৫ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেন এবং ৪৫ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেন। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে স্বাধীনতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে। মে মাসে রয়টার্সের বিশ্লেষণে স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার সমর্থন প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম অবশ্য এখনই দ্বিতীয় স্বাধীনতা গণভোটের অনুমতি দিতে রাজি নন। তাঁর অবস্থান হলো—গণভোটের জন্য স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন প্রয়োজন।
ওয়েলসে আরও বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন
ওয়েলসের পরিস্থিতি আরও নাটকীয়।
২০২৬ সালের Senedd নির্বাচনে Plaid Cymru ৪৩টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে Reform UK—তাদের আসন ৩৪টি। ওয়েলশ লেবার পেয়েছে মাত্র ৯টি আসন।
নতুন ৯৬ আসনের Senedd-এ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪৯টি আসন। অর্থাৎ Plaid Cymru সবচেয়ে বড় দল হলেও এককভাবে সরকার চালানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের নেই।
এটি ওয়েলসের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কারণ ডেভল্যুশন শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়েলসে লেবারই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে গেছে।
আজকের আলোচনায় ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ আইওরওয়েথ প্রধানমন্ত্রী বার্নহামকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়েলস ইংল্যান্ডের কোনো অঞ্চল নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র জাতি। তিনি ওয়েলসের হাতে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মতো আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে স্বাধীনতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাঁর তাৎক্ষণিক লক্ষ্য যুক্তরাজ্য ভেঙে দেওয়া নয়; বরং ওয়েলসের হাতে আরও ক্ষমতা নিশ্চিত করা।
ওয়েলসে স্বাধীনতার পক্ষে কতজন?
এখানেও বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের জানুয়ারির YouGov/BarnCymru জরিপে ২৬ শতাংশ ওয়েলশ ভোটার বলেছেন তারা স্বাধীন ওয়েলস চান, বিপরীতে ৫৪ শতাংশ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ ওয়েলসে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হলেও স্বাধীনতার পক্ষে এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত তৈরি হয়নি।
এ কারণে Plaid Cymru-র বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল হচ্ছে প্রথমে ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো, সরাসরি স্বাধীনতার গণভোটে যাওয়ার পরিবর্তে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের হিসাব আলাদা
উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের চেয়ে আলাদা আইনি কাঠামোর মধ্যে রয়েছে।
১৯৯৮ সালের Good Friday Agreement অনুযায়ী, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাজ্য ছেড়ে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চান বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে, তাহলে ব্রিটিশ সরকারকে গণভোট আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে Sinn Féin দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের পক্ষে। ২০২২ সালের নির্বাচনে Sinn Féin সবচেয়ে বেশি আসন পায় এবং ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো তাদের নেতা মিশেল ও'নিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার হন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে বলেছেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে চান এবং এটি শেষ পর্যন্ত ঘটবে বলে মনে করেন। তাঁর মন্তব্য ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
কিন্তু বার্নহাম সরকার জানিয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতি পরিবর্তিত হয়নি। বর্তমানে ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের পক্ষে গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতো জনসমর্থন নেই বলে সরকারের অবস্থান।
‘সেল্টিক জোট’ কি Westminster-কে চাপে ফেলবে?
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এখানেই।
স্কটল্যান্ডের SNP, ওয়েলসের Plaid Cymru এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের Sinn Féin যদি নিজেদের দাবিতে সমন্বিতভাবে Westminster-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।
রয়টার্স ইতোমধ্যে সম্ভাব্য এই সহযোগিতাকে ‘Celtic alliance’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের সম্ভাব্য দাবির মধ্যে রয়েছে ব্যয়, কর, কল্যাণনীতি এবং আঞ্চলিক সরকারের হাতে আরও ক্ষমতা হস্তান্তর।
তবে তিন দলের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক নয়। SNP চায় স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, Plaid Cymru দীর্ঘমেয়াদে ওয়েলশ স্বাধীনতার সম্ভাবনা ধরে রাখলেও আপাতত বেশি ক্ষমতা চায়, আর Sinn Féin চায় উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের একীকরণ।
ফলে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোট তৈরি করাও সহজ হবে না।
স্বাধীনতার প্রশ্নে জনমত এখনো বিভক্ত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয়তাবাদী দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে গণভোটের ফল হিসেবে দেখা যাবে না।
রয়টার্সের মে মাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বাধীনতা স্কটল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভোটারদের প্রধান বিষয় ছিল না। অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, অভিবাসন, শিক্ষা ও আবাসন—এসব বিষয় স্বাধীনতার প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ওয়েলসে স্বাধীনতা ছিল ভোটারদের অগ্রাধিকারের আরও নিচে।
এটাই Westminster-এর জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা।
কিন্তু অন্যদিকে Reform UK-এর উত্থানও জাতীয়তাবাদীদের নতুন রাজনৈতিক যুক্তি দিচ্ছে। Nigel Farage-এর দল ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ ও কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের জাতীয়তাবাদীরা বলছে, Westminster-এর রাজনীতি তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো বদলে গেলে এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় কর, সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যবসা, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো বদলাতে পারে।
বিশেষ করে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের হাতে যদি আরও ক্ষমতা যায়, তাহলে লন্ডনের Westminster সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের নীতি ও আইনগত পার্থক্য আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি দূরের সাংবিধানিক বিতর্ক নয়। আগামী দিনে একজন বাংলাদেশি ব্রিটিশ নাগরিক কোথায় থাকেন—লন্ডন, কার্ডিফ, গ্লাসগো নাকি বেলফাস্ট—তার ওপর কিছু সরকারি নীতি ও নাগরিক সুবিধার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।
যুক্তরাজ্য কি সত্যিই ভেঙে যাবে?
এই মুহূর্তে উত্তর—না, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
স্কটল্যান্ডে ২০১৪ সালের গণভোটের ফল এখনো রাজনৈতিক বাস্তবতা। ওয়েলসে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত এখনো সংখ্যালঘু। উত্তর আয়ারল্যান্ডেও ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের পক্ষে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমনটা ব্রিটিশ সরকার মানছে না।
কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচন একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—যুক্তরাজ্যের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো আর আগের মতো স্থির নেই।
চার দেশের মধ্যে তিনটিতে জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান, ওয়েস্টমিনস্টারের দলগুলোর প্রতি অসন্তোষ এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক বিতর্ক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে:
তিনি কি পুরোনো যুক্তরাজ্যকে ধরে রাখবেন, নাকি চার জাতির জন্য নতুন ক্ষমতা-বণ্টনের একটি সাংবিধানিক চুক্তি তৈরি করবেন?
কারণ এখন যে বিষয়টি সামনে আসছে তা শুধু স্বাধীনতার দাবি নয়—যুক্তরাজ্যের ভেতরে ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্ন।
এবং সেই প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক বছরের ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে।