লন্ডন সংবাদ
লন্ডনে বাংলাদেশ–ব্রিটেন ট্রেড সেন্টার, প্রবাসী ব্যবসায়ীদের জন্য খুলছে নতুন সম্ভাবনার দরজা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ট্রেড সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি—বিবিসিসিআই।
প্রস্তাবিত এই কেন্দ্রের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি, বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজা, ব্যবসায়িক অংশীদার নির্বাচন এবং নতুন বাজারে প্রবেশের পথ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের আইভি হিল হোটেলে বিবিসিসিআইয়ের বিজনেস রিসেপশন ও নতুন নির্বাচিত কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।
বিবিসিসিআইয়ের মহাপরিচালক মুশলেহ আহমেদ বলেন, মূল লক্ষ্য হলো ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হওয়া যোগাযোগকে বাস্তব বাণিজ্যে রূপ দেওয়া এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা। সম্ভাব্য অংশীদার খুঁজে দেওয়া, নতুন বাজার চিহ্নিত করা এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণেও কেন্দ্রটি সহায়তা করবে।
বিবিসিসিআই সভাপতি মুহিব চৌধুরী বলেছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায় চেম্বার। বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার এম নজরুল ইসলাম অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন।
শুধু রেস্টুরেন্ট নয়, বড় ব্যবসার দিকে প্রবাসীরা
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসার কথা উঠলে সাধারণত রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, ক্যাটারিং কিংবা ছোট ও মাঝারি ব্যবসার কথাই বেশি সামনে আসে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা এখন প্রযুক্তি, ফিনটেক, পেশাদার সেবা, সম্পত্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আমদানি-রপ্তানিসহ নানা খাতে প্রবেশ করছেন।
নতুন ট্রেড সেন্টার কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে এই উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশের বাজারেও প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্থানীয় অংশীদার ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ব্রিটিশ সরকারের ২০২৬ সালের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি চার প্রান্তিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পণ্য ও সেবার মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন পাউন্ড। অর্থাৎ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট বড়। এখন প্রশ্ন হলো—এই সম্পর্ককে আরও কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়।
সেই জায়গায় লন্ডনের ট্রেড সেন্টারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রবাসী তরুণদের জন্যও সুযোগ
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অনেক তরুণ ব্রিটেনে বড় হয়েছেন, ব্রিটিশ শিক্ষা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে জানেন; আবার পারিবারিক সূত্রে বাংলাদেশের বাজার ও সমাজের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ রয়েছে।
এই দুই অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় কাজে লাগানো গেলে একটি নতুন ধরনের উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হতে পারে—যারা একই সঙ্গে ব্রিটেন ও বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করবে।
ট্রেড সেন্টারটি যদি শুধু সভা-সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ব্যবসায়িক সেবা দেয়, তাহলে একজন উদ্যোক্তা সেখানে গিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদার, বাজারসংক্রান্ত তথ্য এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন।
চেম্বার জানিয়েছে, কেন্দ্রটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করবে।
সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়ন
তবে ঘোষণা যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবায়নের প্রশ্নটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেড সেন্টারকে কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছ তথ্য, পেশাদার পরামর্শ, নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক অংশীদার নির্বাচন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে ব্যবসা করতে চান কিংবা ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মতো বাস্তব সহায়তা প্রয়োজন।
সফলভাবে কাজ করতে পারলে লন্ডনের এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র হবে না; এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির অর্থনৈতিক শক্তিকে দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠতে পারে।
লন্ডনের বাঙালিরা গত কয়েক দশকে নিজেদের শ্রমে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। এখন সেই শক্তিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগে কতটা বড় শক্তিতে পরিণত করা যায়—নতুন ট্রেড সেন্টারের আসল সাফল্য সেখানেই।