ঠিক মতো ফেলও করতে পারল না জাতীয় পার্টি !

ঠিক মতো ফেলও করতে পারল না জাতীয় পার্টি !

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ১৩ ফেব্রুয়ারি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্ক কষতে বসেছেন অনেকে। তবে সবচেয়ে বড় অঙ্ক মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনেও জয় নয়—এ যেন রাজনীতির পরীক্ষায় এমন ফেল, যেখানে নম্বরও ওঠেনি, আর খাতাও ঠিকমতো জমা পড়েনি।

সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য দেখা গেছে রংপুর-৩ (সদর) আসনে। যে আসনকে দীর্ঘদিন ধরে জাপার ‘দুর্গ’ বলা হতো। এই রংপুর শহরেই বাস করতেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আবেগ, ঐতিহ্য, ভোটব্যাংক—সব মিলিয়ে এটি ছিল জাপার নিরাপদ ঠিকানা। কিন্তু সেই দুর্গেই এবার তৃতীয় হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের

বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, রংপুর-৩ আসনে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল। দ্বিতীয় হয়েছেন সামসুজ্জামান সামু, পেয়েছেন ৭৪ হাজার ১৭১ ভোট। আর জিএম কাদেরের ঝুলিতে জমা পড়েছে ৩৭ হাজার ৯৩৩ ভোট। দুর্গ রক্ষা তো দূরের কথা, দুর্গে দাঁড়িয়েই তিন নম্বরে।

তার চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে আরেক তথ্য—নির্বাচনের দিন নিজেই ভোটকেন্দ্রে যাননি জিএম কাদের। আগেই ঘোষণা ছিল সকালে ভোট দেবেন। কিন্তু দিনভর তিনি নগরীর নিউসেনপাড়া বাসায় অবস্থান করেন, ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। সমর্থকদের অনেকেই বলছেন, “ভোট না দিলে ভোট পাবেন কীভাবে?”—এই সরল অঙ্কটাই যেন মেলেনি।

এবার আসা যাক গাইবান্ধা-১ আসনে। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। ১২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৩টির ফলে দেখা যায়, তিনিও তৃতীয়। এগিয়ে ছিলেন জামায়াতের মো. মাজেদুর রহমান (৯৪ হাজার ৬৩১ ভোট)। দ্বিতীয় স্থানে ধানের শীষ প্রতীকের জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী (২৪ হাজার ৭৭২ ভোট)। আর জাপার মহাসচিব পেয়েছেন ২১ হাজার ৩৯০ ভোট—প্রথমজনের চেয়ে ৭৩ হাজার ২৪১ ভোট কম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হয়, আসনটিও হাতছাড়া।

রাজনীতিতে হার-জিত থাকবেই। কিন্তু এবার জাতীয় পার্টির অবস্থা এমন যে, জয় তো দূরের কথা—প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারেও নেই। একসময় ক্ষমতার অংশীদার, সংসদের বড় শক্তি, উত্তরবঙ্গের রাজনীতির নিয়ামক—আজ তারা শূন্য হাতে। ফলাফল বলছে, দলটি শুধু নির্বাচনে হারেনি; ভোটারদের মনেও জায়গা হারিয়েছে।

রংপুরে দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু ফল ঘোষণার পর জাপার নেতাকর্মীদের মুখে নেমে আসে নীরবতা। যে শহর একসময় এরশাদের নামে রাজনীতি মাপত, সেই শহর এবার অন্য স্রোতে ভেসেছে। দুর্গে পতাকা উড়েছে, তবে সেটি আর লাঙলের নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু একটি দলের পরাজয় নয়; এটি শক্তির ভারসাম্য বদলের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে জাতীয় পার্টির জন্য কঠিন বার্তা—আত্মসমালোচনা, পুনর্গঠন এবং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই কেবল নতুন সংসদ গঠনের গল্প নয়; এটি কিছু দলের উত্থানের পাশাপাশি এক সময়ের প্রভাবশালী দলের নিঃশব্দ অবতরণের ইতিহাস। আর জাতীয় পার্টির জন্য—এ যেন এমন ফেল, যেখানে রেজাল্টের খাতায় নাম থাকলেও নম্বরের ঘরে কেবল শূন্য।