ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ দলের সবাই পরাজিত —এ কি রাজনৈতিক অযোগ্যতার পরীক্ষা?
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক রিপোর্ট, ১৩ ফেব্রুয়ারি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ফল ঘোষণার পর দেখা গেল, তাদের মধ্যে ৪২টি দল একটি আসনও পায়নি। ভোট হয়েছে, প্রার্থী ছিল, প্রতীক ছিল—কিন্তু সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী ২৯৭টি আসনের অধিকাংশ গেছে দুই প্রধান শক্তির দখলে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে ২১২টি আসন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জোটের শরিক এনসিপি ছয়টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি দল একটি করে আসন পেয়েছে এবং সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
কিন্তু বাকি ৪২ দলের প্রাপ্তি—শূন্য।
যেসব ৪২টি দল কোনো আসন পায়নি, তাদের অনেকেই শতাধিক আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। ব্যানার ছিল, পোস্টার ছিল, প্রতীক ছিল, নির্বাচনী ইশতেহারও ছিল। কিন্তু ভোটের বাক্স খুলতেই দেখা গেল—তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা কাগজেই সীমাবদ্ধ। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বাড়লেও প্রশ্ন উঠছে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে। অনেক দলের কার্যক্রম নির্বাচনের মৌসুমেই দৃশ্যমান হয়। সারা বছর মাঠে আন্দোলন, জনসম্পৃক্ততা, নীতি নির্ধারণ বা সামাজিক উপস্থিতি—এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা স্পষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন ছিল স্পষ্টভাবে মেরুকৃত। বড় দলকেন্দ্রিক জোট, কৌশলগত ভোটিং এবং ‘ভোট নষ্ট না করার’ মানসিকতা ছোট দলগুলোর সম্ভাবনা সংকুচিত করেছে। ভোটাররা হয়তো ভাবেছেন—ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা যাদের আছে, ভোট তাদের দিকেই দেওয়া যুক্তিযুক্ত।
ফলে বহুদলীয় ব্যালট পেপার থাকলেও কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে গেছে কয়েকটি বড় শক্তির মধ্যে। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন দুই হাজারের বেশি—দলীয় ১,৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সংখ্যার এই প্রাচুর্য ফলাফলে প্রতিফলিত হয়নি।
কোনো আসন পায়নি যেসব দল
নির্বাচনে অংশ নিয়েও কোনো আসনে জয় পায়নি নিম্নোক্ত দলগুলো—
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি),
জাতীয় পার্টি (জাপা),
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি),
গণতন্ত্রী পার্টি,
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ),
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি),
জাকের পার্টি,
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ),
বাংলাদেশ মুসলিম লীগ,
ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি),
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ,
গণফোরাম,
গণফ্রন্ট,
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ),
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ,
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি,
ইসলামী ঐক্যজোট,
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা),
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি,
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট,
বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ),
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম),
বাংলাদেশ কংগ্রেস,
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ,
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ),
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি),
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি),
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি,
বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি),
বাংলাদেশ লেবার পার্টি,
বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি),
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী),
জনতার দল,
আমজনতার দল,
বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি),
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
(তালিকাটি নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফলের ভিত্তিতে।)
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল গঠন ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধান সেই সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু যখন পরপর নির্বাচনেও একটি দল ন্যূনতম জনসমর্থন প্রমাণ করতে পারে না, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—শুধু নিবন্ধন থাকলেই কি রাজনৈতিক দল টিকে থাকার নৈতিক বৈধতা পায়?
এখানে অধিকার কেড়ে নেওয়ার কথা নয়। বরং প্রশ্নটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার। যদি একটি দল শতাধিক প্রার্থী দেয়, কিন্তু মাঠে সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা ও নীতিগত অবস্থান দৃশ্যমান না থাকে—তাহলে তা কি কেবল নির্বাচনী প্রতীকের ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায় না?
গণতন্ত্র বহুদলীয় হোক—এটাই কাম্য। কিন্তু বহুদলীয় মানে কি কার্যকর বহু দল, নাকি কাগুজে বহু দল?
৪২ দলে শূন্য ফলাফল কেবল নির্বাচনী পরিসংখ্যান নয়। এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার আয়না। এখন সিদ্ধান্ত তাদের—তারা কি নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি কেবল নামমাত্র অস্তিত্ব ধরে রেখে ভোটের মৌসুমে আবারও হাজির হবে?
গণতন্ত্র অধিকার দেয়, কিন্তু জনসমর্থনই দেয় বৈধতা।