কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৮ ।। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের নেপথ্য কারণ : একটি বিশ্লেষণ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৮ ।।  বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের নেপথ্য কারণ : একটি বিশ্লেষণ

উৎসর্গ

“যারা ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছেন—সেই সচেতন ভোটারদের প্রতি।”

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্ত, যা দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ বাস্তবতাকে ভেঙে নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি করেছে। এই নির্বাচনে বিএনপির (২১২টি আসন লাভ) নিরঙ্কুশ বিজয়কে অনেকে অবধারিত বলছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন এটি প্রতিদ্বন্দ্বীর অনুপস্থিতির সুযোগ। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে, এই ফলাফলকে বোঝার জন্য প্রথমেই যে বিষয়টি আলোচনায় আনা প্রয়োজন, তা হলো দলের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা—বিশেষ করে তারেক রহমানের ভূমিকা। ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবনেও তিনি প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে দলকে শুধু টিকিয়েই রাখেননি, বরং সংগঠনকে পুনর্গঠিত করেছেন। ভার্চুয়াল মিটিং, অনলাইন ব্রিফিং, দূরবর্তী নেতৃত্ব—এসবের মাধ্যমে তিনি এমন এক নেতৃত্ব মডেল তৈরি করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন।

বিএনপি যখন মাঠে চাপে ছিল, তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই দূরবর্তী কিন্তু ধারাবাহিক উপস্থিতি দলটিকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তারেক রহমানের নিয়মিত বক্তব্য, নির্দেশনা এবং সাংগঠনিক বার্তা নেতাকর্মীদের মধ্যে মনোবল ধরে রেখেছে। একটি দল যখন দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূলতার মধ্যে থাকে, তখন নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে ওঠে—বিএনপি সেই সম্পদটি কাজে লাগাতে পেরেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল সেই দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বেরই প্রতিফলন।

নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটি পূরণে বিএনপি ছিল সবচেয়ে প্রস্তুত দল। কারণ তারা সংগঠনকে কখনোই ভেঙে যেতে দেয়নি। ইউনিয়ন–ওয়ার্ড পর্যায়ের নেটওয়ার্ক, আন্দোলন-সংগ্রামে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ, এবং স্থানীয় নেতৃত্বের টিকে থাকা—এসবই তাদের নির্বাচনী যুদ্ধে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। রাজনীতিতে সংগঠনই শেষ কথা—এ সত্যটি আবারও প্রমাণিত হলো।

বিএনপির বিজয়ে আরেকটি বড় উপাদান হলো ভুক্তভোগিতার রাজনীতি। গত এক দশকে দলটির নেতাকর্মীরা যে মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে গেছে, তা জনমনে সহানুভূতির স্রোত তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ভোটাররা আবেগপ্রবণ; তারা অন্যায়ের শিকারকে সমর্থন দিতে দ্বিধা করে না। এই নির্বাচনে সেই আবেগ ভোটে রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলে থেকে দীর্ঘ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক পুঁজি এবার বাস্তব ফল দিয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াতের উত্থানও এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ৬৮টি আসন তাদের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। উত্তরবঙ্গ, ঢাকার কিছু এলাকা এবং নগরভিত্তিক ভোটে তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে দৃশ্যমান। জামায়াতের ভোট আঞ্চলিক; সারা দেশে বিস্তৃত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ, নারীনীতি, অতীতের সহিংসতা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিতর্ক অনেক ভোটারকে শেষ মুহূর্তে সতর্ক করেছে। এই সতর্কতাই কৌশলগতভাবে বিএনপির দিকে ভোট ঠেলে দিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে জামায়াতের পক্ষে যে প্রবল হাইপ তৈরি হয়েছিল, তা ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়নি। ডিজিটাল আওয়াজ সবসময় মাঠের বাস্তবতা নয়—এটি আবারও প্রমাণিত হলো। বাংলাদেশের ভোটার শেষ পর্যন্ত পরিচিত, সংগঠিত এবং সরকার পরিচালনায় সক্ষম দলকেই অগ্রাধিকার দেয়। সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণা বাস্তব ভোটে রূপ নিতে হলে মাঠপর্যায়ের সংগঠন অপরিহার্য—জামায়াত সেই জায়গায় পিছিয়ে ছিল।

নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত বাস্তবতাও বিএনপির পক্ষে গেছে। ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে সামান্য ভোট ব্যবধানও আসনে বিশাল ব্যবধানে রূপ নেয়। বিএনপি দেশজুড়ে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এই কাঠামোগত সুবিধা তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছে। মোট ভোটের শতাংশ খুব বেশি না হলেও আসনের হিসেবে তা ভূমিধ্বস বিজয়ে পরিণত হয়েছে।

সংখ্যালঘু, কৃষক ও শ্রমজীবী ভোটের পুনর্বিন্যাসও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের একটি অংশ এবার বিএনপির দিকে সরে এসেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি, বাজারদর, কৃষকের সংকট—এসব ইস্যুতে বিএনপির প্রচার কার্যকর হয়েছে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল, এবং সেই আকাঙ্ক্ষা বিএনপির পক্ষে গেছে। শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের তাগিদ ছিল স্পষ্ট।

জামায়াতের কিছু নেতার বিতর্কিত বক্তব্য, নির্বাচনের আগে টাকাসহ আটক হওয়ার ঘটনা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা তাদের প্রচারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যে হাইপ তৈরি হয়েছিল, তা শেষ সপ্তাহে ভেঙে পড়ে। বিএনপি অনেক আসনে পরিচিত, অভিজ্ঞ এবং পূর্বে নির্বাচিত প্রার্থী দিয়েছে—এটিও ভোটারদের আস্থা বাড়িয়েছে। অপরিচিত মুখের তুলনায় পরিচিত নেতৃত্বকে ভোটাররা বেশি বিশ্বাস করে—এটি আবারও প্রমাণিত হলো।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় নতুন সরকারের হাতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তুলে দিয়েছে। যদিও প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আছে, তবুও এটি জনগণের পরিবর্তন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে এই গণভোট নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতের নীতি-নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয় কোনো একক কারণের ফল নয়। এটি নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, সংগঠনের শক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বীর সীমাবদ্ধতা, কৌশলগত ভোট এবং জনমনের পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রতিফলন। জামায়াতের শক্তিশালী উপস্থিতি সংসদে নতুন ধরনের বিরোধী রাজনীতির জন্ম দেবে—এটি নিশ্চিত। এখন দেখার বিষয়—বিএনপি এই ম্যান্ডেটকে কীভাবে কাজে লাগায়। ক্ষমতায় ফেরা সহজ; প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন। অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা—সব ক্ষেত্রেই তাদের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, এবং এই অধ্যায় কতটা স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক হবে—তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরের রাজনৈতিক আচরণের ওপর।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬