“বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা কার্যত বেআইনি” — নূরুল কবীর
ঢাকা: বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর কারণে সাংবাদিকতা পেশা কার্যত “বেআইনি অবস্থার” মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। বাংলাভিশনের টকশো ‘ফ্রন্ট লাইন’-এ অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দেশে সাংবাদিকরা প্রতিদিনই আইন ভঙ্গ করে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ প্রচলিত আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পূর্ণ সুযোগ দেয় না।
অনুষ্ঠানে নূরুল কবীর বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সেখানে এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা বাস্তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। তার ভাষায়, “এক হাতে অধিকার দেয়া হয়েছে, আরেক হাতে তা কেড়ে নেয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, সংবিধানের শর্ত অনুযায়ী এমন কিছু লেখা যাবে না যা অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে বা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি ইসরাইল, ভারত, ইরান, লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে সত্য কথা বললেও যদি তা কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে আটকে যায়, তাহলে সাংবাদিকতা স্বাধীনভাবে করা সম্ভব হয় না।
নূরুল কবীর আরও বলেন, মন্ত্রীরা একদিকে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন, অন্যদিকে গোপনীয়তার শপথও নেন। ফলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি ব্রিটিশ আমলের ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের সমালোচনা করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এই আইন বহাল রয়েছে। তার মতে, এই আইনের কারণে সরকারি তথ্য প্রকাশে সাংবাদিকদের ঝুঁকি নিতে হয়।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হচ্ছে তথ্যের অবাধ প্রবাহ। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতিনির্ধারণী আলোচনা কিংবা প্রশাসনিক তথ্য প্রকাশ অনেক সময় আইনগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ১৯৭৩ সালের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন আইনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, পত্রিকার ডিক্লারেশন নেয়ার সময় এমন অঙ্গীকারনামা দিতে হয় যেখানে বলা আছে, সরকারের স্বার্থের পরিপন্থি কিছু প্রকাশ করা যাবে না। অথচ বহু ক্ষেত্রে সরকারি স্বার্থ ও জনস্বার্থ পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়।
নূরুল কবীর বলেন, “আমরা অনেক তথ্য খুঁজে বের করি, প্রকাশ করি, সরকার পরিবর্তন হয়—কিন্তু আইনগতভাবে দেখলে সেসব কাজের অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় করতে হয়।” তারপরও তিনি সাংবাদিকতাকে বৈধ ও প্রয়োজনীয় পেশা হিসেবেই দেখতে চান বলে উল্লেখ করেন।
টকশোতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মামলার বিষয়টিও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয় সাংবাদিকতা “অশ্লীল মাত্রায়” পৌঁছেছিল এবং অনেক সাংবাদিক নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “দালালি” নৈতিকভাবে নিন্দনীয় হলেও তা ফৌজদারি অপরাধ নয়, যদি কেউ সরাসরি সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত না থাকেন।
তার ভাষায়, গত সরকারের সময়ে সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ সাধারণভাবে প্রমাণিত হয়নি। তিনি বলেন, জনগণ যেসব সাংবাদিককে সম্মান করে না, সেটিও এক ধরনের সামাজিক শাস্তি।
নূরুল কবীর আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, আটক সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত আইনি সুবিধাও দেয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট অপরাধে কেউ জড়িত থাকলে অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান বা মতের কারণে কাউকে অন্যায়ভাবে কারাগারে রাখা হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হবে। তার মতে, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে এমন আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুষ্ঠানের শেষদিকে নূরুল কবীর বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হলে মতপ্রকাশের পথে থাকা পুরোনো ও দমনমূলক আইনগুলো বাতিল বা সংস্কার করা জরুরি। তিনি বলেন, “এটা শুধু সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশের প্রশ্ন নয়, দেশের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্নও।”