মানুষ বদলেছে, দেহ নয়: আধুনিকতার এক অস্বস্তিকর সত্য

মানুষ বদলেছে, দেহ নয়: আধুনিকতার এক অস্বস্তিকর সত্য

তথ্য কণিকা ডেস্ক ।।  উঁচু ভবন, দ্রুতগতির যানবাহন, স্মার্টফোন আর কৃত্রিম আলো—এই হলো আধুনিক মানুষের স্বাভাবিক জগত। শহরে থাকতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, নিরাপদ মনে করি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে আমাদের শরীরের সম্পর্ক মোটেও মসৃণ নয়। বরং শরীরের ভেতরে জমে উঠছে এক নীরব সংঘাত।

ইউরোপের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর সত্য—মানুষের জীবনযাপন যেভাবে বদলে গেছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি মানবদেহের জৈবিক কাঠামো। আধুনিক সভ্যতা যে গতিতে এগিয়েছে, বিবর্তনের ধীর গতিতে শরীর সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।

প্রকৃতির সঙ্গে গড়া শরীর

মানব ইতিহাসের বড় একটি সময় মানুষ কাটিয়েছে প্রকৃতির কোলে। খোলা আকাশ, সবুজ বন, সূর্যের আলো আর ঋতুচক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের দেহের প্রতিটি সিস্টেম। তখন জীবন ছিল কষ্টসাধ্য, কিন্তু ছন্দময়। ভয় ও বিপদ আসত হঠাৎ, আবার দ্রুত কেটে যেত। শরীরও জানত কখন উত্তেজিত হতে হবে, আবার কখন শান্ত হতে হবে।

শহরের চাপে ক্লান্ত শরীর

কিন্তু আধুনিক শহরে সেই ছন্দ আর নেই। শব্দদূষণ, যানজট, কৃত্রিম আলো, দূষিত বাতাস, দীর্ঘ সময় বসে থাকা আর সারাক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা—এসবই আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। শরীর প্রতিনিয়ত চাপের সংকেত পাচ্ছে, অথচ সেই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ খুব কমই মিলছে।

ফলে যা হওয়ার কথা ছিল ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা, তা পরিণত হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী চাপের বোঝায়। শরীর ভুল করে প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি নোটিফিকেশন, প্রতিটি কাজের ডেডলাইনকে প্রাণঘাতী বিপদের মতো করে নিচ্ছে। বিশ্রামের অভাবে ক্লান্ত হচ্ছে স্নায়ুতন্ত্র, দুর্বল হয়ে পড়ছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা।

প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যতের ওপরও

এই জীবনযাপনের প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে প্রজনন সক্ষমতা কমছে, বাড়ছে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ। বিশেষ করে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমে যাওয়ার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এর পেছনে পরিবেশদূষণ, প্লাস্টিকজাত রাসায়নিক আর বিষাক্ত উপাদানের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিবর্তনের দৃষ্টিতে সুস্থ প্রজাতি মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাও। আধুনিক সমাজ আমাদের আয়ু বাড়ালেও, সেই সঙ্গে দেহের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে—এমন সতর্কতাই দিচ্ছেন গবেষকেরা।

বদলাতে হবে পরিবেশ, শরীর নয়

মানুষ একদিনে নিজের জিন বদলাতে পারবে না। বিবর্তন সময় নেয় হাজার হাজার বছর। তাই সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশ বদলে ফেলার মধ্যেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শহরকে আরও মানববান্ধব করতে হবে—সবুজ এলাকা বাড়াতে হবে, প্রাকৃতিক আলো ও নির্মল বাতাসের সুযোগ তৈরি করতে হবে, মানুষকে ঘরের বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করতে হবে।

পরিবেশ শরীরকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বুঝে নগর পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য নীতিতে পরিবর্তন আনা গেলে এই সংকট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।

প্রকৃতির কাছে ফেরার আহ্বান

গবেষণার সারকথা একটিই—আমরা যত আধুনিক হচ্ছি, ততই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। অথচ আমাদের শরীর আজও প্রকৃতির সন্তান। সুস্থ থাকতে হলে, মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে হলে—আবারও সেই প্রাকৃতিক ছন্দের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।