দেশে চা বাগানে উদ্বেগজনক হারে কুষ্ঠরোগ, দারিদ্র্য ও চিকিৎসা-অবহেলাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

দেশে চা বাগানে উদ্বেগজনক হারে কুষ্ঠরোগ, দারিদ্র্য ও চিকিৎসা-অবহেলাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশ প্রতিনিথি, ১৫ জুলাই:

বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে কুষ্ঠরোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে এ রোগের হার দেশের গড়ের তুলনায় বহু গুণ বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, নিম্নমানের আবাসন, সচেতনতার অভাব এবং নিয়মিত চিকিৎসা না নেওয়ার কারণেই চা শ্রমিকদের মধ্যে কুষ্ঠরোগের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের ১৩৬টি চা বাগানে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে দুই হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা পেয়েছেন। প্রতি বছরই কয়েকশ নতুন রোগী চিহ্নিত হচ্ছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, কুষ্ঠরোগের শুরুতে ত্বকে অনুভূতিহীন সাদা বা বিবর্ণ দাগ দেখা দিলেও অনেকেই এটিকে সাধারণ চর্মরোগ ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি তৈরি হয়।

চা বাগান এলাকায় কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক শ্রমিক ওষুধ খাওয়া শুরু করলেও মাঝপথে তা বন্ধ করে দেন। এতে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জটিলতা বাড়ে। আবার অনেকের পক্ষে দূরের হাসপাতালে গিয়ে নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ করাও অর্থনৈতিক কারণে সম্ভব হয় না।

গবেষকদের মতে, চা শ্রমিকদের বড় একটি অংশ অপুষ্টিতে ভোগেন এবং তারা ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করেন। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব ও আর্থিক সংকটের কারণে রোগ দ্রুত শনাক্ত হয় না। ফলে একই পরিবারের বা আশপাশের মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।

সরকারের জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার কুষ্ঠ সংক্রমণের দিক থেকে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশকে এমন দেশগুলোর মধ্যে রেখেছে, যেখানে প্রতিবছর এক হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ওষুধ দিয়ে কুষ্ঠ নির্মূল সম্ভব নয়। চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, পুষ্টিকর খাদ্য, উন্নত আবাসন, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে কুষ্ঠজনিত অঙ্গহানি ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।