ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি । । ১৩৯ ।। ভাসমান বাড়ি, উঁচু সড়ক ও জলসহনশীল রেলপথে বাংলাদেশের নতুন ভবিষ্যৎ

কলিকালের কলধ্বনি । । ১৩৯ ।।  ভাসমান বাড়ি, উঁচু সড়ক ও জলসহনশীল রেলপথে বাংলাদেশের নতুন ভবিষ্যৎ

উৎসর্গ

আগামী বাংলাদেশের শিশুদের, যেন তারা বন্যার আতঙ্ক নয়, নিরাপদ ও টেকসই এক দেশ উত্তরাধিকার হিসেবে পায়।”

প্রতিবছর বর্ষা এলেই বাংলাদেশের পরিচিত দৃশ্য—ঘরের মেঝেতে পানি, রান্নাঘর ডুবে যায়, বিদ্যালয় বন্ধ হয়, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, রেল চলাচল ব্যাহত হয়। তারপর শুরু হয় ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং নতুন করে ঘর নির্মাণের চক্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতদিন আমরা একই সমস্যার পেছনে একই সমাধান খুঁজব?

জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ব্রিটেন, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলো সমস্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস তার সবচেয়ে সফল উদাহরণ।

দেশটির এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। তারপরও তারা শুধু বাঁধ নির্মাণ করেনি; বরং "Living with Water" বা "পানির সঙ্গে বসবাস" নীতিকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ করেছে। সেখানে ভাসমান বাড়ি, জলসহনশীল অবকাঠামো, প্রশস্ত নদীপথ, অতিরিক্ত পানি ধারণের এলাকা এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। বরং নদী, হাওর, চর ও প্লাবনভূমির কারণে আমাদের জন্য এই ধারণা আরও প্রাসঙ্গিক।

প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে ভাসমান বা অ্যাম্ফিবিয়াস (Amphibious) বাড়ি নির্মাণ।

এ ধরনের বাড়ি স্বাভাবিক সময়ে মাটির ওপর থাকে। কিন্তু বন্যার পানি বাড়লে বিশেষ ভাসমান ভিত্তির সাহায্যে পুরো বাড়ি পানির সঙ্গে ওপরে উঠে যায়। শক্তিশালী স্টিলের খুঁটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় এটি স্রোতে ভেসে যায় না। পানি নেমে গেলে বাড়িটিও আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে। বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ নমনীয় পাইপ ও সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সচল থাকে।

অনেকে ভাবেন, এটি শুধু ইউরোপের প্রযুক্তি। বাস্তবে তা নয়।

বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে বাংলাদেশি ও ডাচ গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরীক্ষামূলক অ্যাম্ফিবিয়াস বাড়ি নির্মাণ হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পগুলো দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ এলাকায় এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু শুধু বাড়ি ভাসালে হবে না। মানুষ যদি ঘর থেকে বের হতে না পারে, তবে উন্নয়নের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

তাই দ্বিতীয় বড় পরিকল্পনা হতে হবে বন্যাসহনশীল সড়ক।

বাংলাদেশে অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক আশপাশের জমির সমান বা সামান্য উঁচু হওয়ায় কয়েক দিনের বন্যাতেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ বিশ্বের অনেক দেশে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের প্রধান সড়কগুলো আশপাশের ভূমি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু করে নির্মাণ করা হয়। শক্তিশালী জিওটেক্সটাইল, উন্নত ড্রেনেজ, পর্যাপ্ত কালভার্ট, সেতু এবং ঢালের সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করলে রাস্তা দীর্ঘদিন টেকসই থাকে।

যেখানে স্থায়ী উঁচু রাস্তা সম্ভব নয়, সেখানে মডুলার বা প্রিফ্যাব উঁচু সড়ক নির্মাণ করা যেতে পারে, যা দ্রুত মেরামত ও সম্প্রসারণযোগ্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাস্তা কখনোই নদী বা বন্যার স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করবে না। তাই পর্যাপ্ত কালভার্ট ও সেতুর মাধ্যমে পানি চলাচলের সুযোগ রাখতে হবে। নেদারল্যান্ডসের "Room for the River" ধারণাও এ কথাই বলে—নদীকে জায়গা দিলে নদী শহর ভাঙে না। তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রেলপথ।

বাংলাদেশের বহু রেললাইন নিচু এলাকায় নির্মিত হওয়ায় বন্যার সময় ট্র্যাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সমাধান হতে পারে কয়েকটি ধাপে।

প্রথমত, বন্যাপ্রবণ এলাকায় রেললাইনকে ধাপে ধাপে উঁচু বাঁধের ওপর স্থানান্তর করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রেললাইনের নিচে পর্যাপ্ত কালভার্ট ও জলপ্রবাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে পানি একদিকে আটকে না থাকে।

তৃতীয়ত, যেখানে নদী বা হাওরের বিস্তৃতি বেশি, সেখানে দীর্ঘ ভায়াডাক্ট বা উঁচু সেতুভিত্তিক রেলপথ নির্মাণ করতে হবে। এতে পানি ও নৌযান উভয়ের চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

চতুর্থত, সেন্সরভিত্তিক স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করে ট্র্যাকের নিচে মাটি সরে যাওয়া, অতিরিক্ত পানি বা দুর্বলতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

জাপান, নেদারল্যান্ডস এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি ইতোমধ্যে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য আরও কয়েকটি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিটি বন্যাপ্রবণ উপজেলায় বহুমুখী উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র, ভাসমান বিদ্যালয়, ভাসমান স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সৌরবিদ্যুৎচালিত ভাসমান বিদ্যুৎব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভাসমান কৃষি এবং নৌপথভিত্তিক জরুরি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভাসমান কৃষিতে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভাসমান আবাসন ও জলসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণেও বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

এটি ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি, পুনর্নির্মাণ, ত্রাণ এবং অবকাঠামো সংস্কারে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, দীর্ঘমেয়াদে তার চেয়ে পরিকল্পিত বিনিয়োগ অনেক বেশি লাভজনক হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এখন একটি নতুন দর্শনের সময় এসেছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং বন্যার মধ্যেও নিরাপদ, স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

নদীকে শত্রু মনে করলে আমরা বারবার হারব। নদীকে সঙ্গী হিসেবে মেনে নিয়ে পরিকল্পনা করলে বাংলাদেশ একদিন জলবায়ু অভিযোজনের বিশ্বমডেলে পরিণত হতে পারে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১৫ জুলাই ২০২৬