ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৮ ।। বোবারও শত্রু আছে

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৮ ।। বোবারও শত্রু আছে

।। বোবারও শত্রু আছে ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ
“সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা সেইসব মানুষকে,
যাদের কোনো পরিচয় নেই, কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো আওয়াজ নেই—
কিন্তু যাদের জীবনও সমান মূল্যবান।”

"বোবা খালা" বুবি বেগম

রসিংদী জেলার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনটা খুব বড় নয়। দিনে কয়েকটা ট্রেন আসে, কয়েকটা যায়। কিন্তু স্টেশনটার একটা অদ্ভুত পরিচয় আছে—সকালে ঘুম ভাঙার আগেই কেউ একজন পুরো প্ল্যাটফর্ম ঝকঝকে পরিস্কার করে রাখে।

কেউ তাকে নাম ধরে ডাকে না।

কারও কাছে সে "বোবা খালা", কারও কাছে "চাচি", কারও কাছে শুধু "ওই মহিলা"। কারণ তিনি বাক্প্রতিবন্ধী।  নাম আসল নাম বুবি বা ববি বেগম। বয়স প্রায় ৭০। 

কোথা থেকে এসেছেন, তাও কেউ জানে না। শুধু এটুকু জানে, সে কথা বলতে পারে না। লোকে বলে, প্রায় ২৫ বছর আগে ট্রেনে চড়ে এসে নেমেছিলেন মেথিকান্দা স্টেশনে। সেই যে তিনি এলেন, তারপর আর কোথাও যাননি। মেথিকান্দা স্টেশনই হয়ে উঠেছে তার আশ্রয়, তার জীবন, তার নীরব বসতি। থাকেন স্টেশনের কোনায় এক পরিত্যক্ত ঘরে।

রাত নামলেই ছোট্ট রেলস্টেশনটা যেন অন্য এক পৃথিবী হয়ে যায়। দিনের কোলাহল থেমে গেলে শুধু বাতাসের শব্দ, দূরের ট্রেনের হুইসেল আর প্ল্যাটফর্মের পুরোনো বাতিগুলোর কাঁপতে থাকা আলো। আবার ভোরে সবাই ঘুমিয়ে থাকলেও তিনি হাতে একটা পুরোনো ঝাড়ু নিয়ে প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করেন।

যাত্রীদের কেউ পাঁচ টাকা দেয়, কেউ দশ। কেউ আবার বলে—

—"কাজ না করে ভিক্ষা করে খায়!"

কিন্তু অনেকেই জানে না, যার দিকে আঙুল তুলছে, সেই নারী তার ফেলে দেওয়া ময়লাই কুড়িয়ে রেখেছে।

চায়ের দোকানি করিম প্রায়ই এক কাপ চা এগিয়ে দেয়।

—"খালা, এত টাকা জমিয়ে কী করবে?"

বোবা মহিলা হেসে বুকের কাছে দুই হাত জড়িয়ে ধরে।

করিম বুঝে যায়। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ টাকা জমায় ভবিষ্যতের ভরসায়, লোভে নয়।

কিন্তু এই দেশে মানুষের স্বপ্নেরও বাজারদর আছে।

এক রাতে কয়েকজন যুবক আসে মধ্য রাতে। তাদের চোখে ক্ষুধা নেই, আছে লোভ। তারা জানে, বোবা মহিলার কাছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা জমা আছে। এদের মধ্যে ইশারায় টাকা চায়। চাঁদা দাবি করে ওরা।

মহিলা অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে না করেন।

তারপর শুরু হয় এলোপাতাড়ি লাথি।

ঘুষি।

লাঠি।

সত্তর বছরের বৃদ্ধা গুরুতর আহত হন। কক্ষে লুকিয়ে রাখা প্রায় ৪০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় ওরা।

তিনি চিৎকার করতে পারেন না।

পৃথিবীতে অনেক মানুষ সাহায্য চেয়ে চিৎকার করে। কেউ শুনে না।

কিন্তু তিনি তো চিৎকারও করতে পারেন না।

তাঁর নীরবতাও কেউ শোনে না।

পরদিন সকালে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

হাসপাতালে নেওয়ার সময় তিনি শুধু একবার স্টেশনের দিকে তাকান।

সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছিল না।

অভিযোগও ছিল না।

ছিল শুধু এক ধরনের বিস্ময়—

"আমি তো কারও ক্ষতি করিনি!"

রাত সোয়া ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।।

স্টেশনে একদিন শোকের নীরবতা নামে।

পরদিন আবার সব স্বাভাবিক।

চা বিক্রি হয়।

টিকিট কাটা হয়।

ট্রেন আসে।

মানুষ হাসে।

সংবাদপত্রের পাতায় খবরটা ছোট হয়ে যায়।

তারপর হারিয়ে যায়।

শুধু হারায় না একটাই জিনিস—

আমাদের বিবেকের দেউলিয়াত্ব।

সবাই বলে, অপরাধীদের শাস্তি হবে।

তদন্ত হবে।

বিচার হবে।

ফাইল খুলবে।

ফাইল বন্ধ হবে।

বক্তৃতা হবে।

ছবি তোলা হবে।

তারপর নতুন কোনো খুন, নতুন কোনো শিরোনাম পুরোনো রক্তের দাগ ঢেকে দেবে।

এই রাষ্ট্র খুব শক্তিশালী।

এ রাষ্ট্র বক্তৃতা দিতে পারে। সেলফি তুলতে পারে। ফেইসবুকে পোস্ট দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখের জলের ইমোজি দিতে পারে।

সেমিনার করতে পারে।

মানবতার ব্যানার টাঙাতে পারে।

শুধু একজন বোবা বৃদ্ধাকে বাঁচাতে পারে না।

এই সমাজও খুব সভ্য। এ দেশে এই সবকিছু মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে। যেমন গা সওয়া হয়ে যায় পুরনো চুলকানি।

দুই মিনিট নীরবতা পালন করতে পারে।

শুধু পাশের প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা অসহায় বুবি বেগমের পাশে দাঁড়াতে পারে না।

সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, যে নারী কোনো দিন কাউকে গাল দেয়নি, কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়নি, রাজনীতি করেনি, মিছিল করেনি, ক্ষমতা চায়নি—তারও শত্রু ছিল।

তখন মনে হয়, এ দেশে বোবারও শত্রু আছে।

আর যে দেশে বোবারও শত্রু থাকে, সে দেশের আসল বোবা মানুষ নয়—বিবেক।

আর সেই বিবেকের জানাজায় সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে দর্শক হয়ে, রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে প্রটোকল নিয়ে, আর প্রশাসন দাঁড়িয়ে থাকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি হাতে।

সেদিন একজন বোবা নারী মারা যায় না।

মরে যায় মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষটাও। তিনি যেন প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেন—

আসলে একজন মানুষকে হত্যা করা শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; সমাজের ভেতরকার মানবিকতারও একটি অংশ সেদিন মারা যায়।

লন্ডন, ১৫ জুলাই ২০২৬