‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩২ ।। চিরদিনের ছুটির ঘন্টা

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩২ ।। চিরদিনের ছুটির ঘন্টা

।। চিরদিনের ছুটির ঘন্টা।।

উৎসর্গ

“সুরাইয়ার স্মৃতিতে”
সড়কে হারিয়ে যাওয়া সেইসব শিশুদের প্রতি, যারা একদিন স্কুলের ছুটির ঘণ্টা শুনে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন নিয়ে বের হয়েছিল—কিন্তু আর ফিরে আসেনি।

বিকেল সোয়া চারটা।

সিলোনিয়া হাইস্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজে।

টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যায় ঘণ্টার টুংটাং। শ্রেণিকক্ষের দরজা খুলে ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে আসে। কারও হাতে ছাতা, কারও হাতে বই। কেউ দৌড়ে গেটের দিকে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

ক্লাশ সিক্সের ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার তার স্কুলব্যাগটা কাঁধে তুলে নেয়।

‘চল, রাইসা,’ সে বলে, ‘আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব। আম্মু বলছে বৃষ্টির মধ্যে দেরি না করতে।’

রাইসা হাসে।

‘তুই আগে যা। আমার ছাতা নেই।’

‘আমার ছাতার নিচে আয়।’

দুই বন্ধু পাশাপাশি দাঁড়ায়।

গেটের বাইরে তখন যানবাহনের ব্যস্ততা। ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক দিয়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে।

দশম শ্রেণির শ্রেয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছোট ভাইকে খুঁজছে।

‘এইদিকে দাঁড়াস না,’ সে কয়েকজন ছোট শিক্ষার্থীকে বলে। ‘গাড়িগুলো খুব জোরে আসছে।’

একজন ছেলে হেসে বলে,

‘আপু, আমরা তো রাস্তার ওপর যাচ্ছি না।’

শ্রেয়া কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে একটি বাস দেখা যায়।

বাসটি দ্রুত এগিয়ে আসছে।

বৃষ্টি আরও বেড়ে যায়।

কয়েকজন শিক্ষার্থী রাস্তার একেবারে কিনারায় সরে দাঁড়ায়।

শ্রেয়া হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—

‘পিছনে যাও! পিছনে যাও!’

কিন্তু সময় আর থাকে না।

বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক ঝটকায় সড়কের পাশের দিকে উঠে আসে।

একটি বিকট শব্দ।

তারপর চিৎকার।

‘বাঁচাও!’

‘ওই বাচ্চাটাকে ধরো!’

‘বাস থামাও!’

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আনন্দের জায়গাটি পরিণত হয় আতঙ্কে।

সুরাইয়া মাটিতে পড়ে যায়। সাথে আরও সাত/আটজন শিক্ষার্থী ছিটকে পড়ে। কেউ বাসের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়।

শ্রেয়া দৌড়ে যায়।

‘সুরাইয়া! সুরাইয়া! চোখ খোল!’

কোনো উত্তর নেই।

স্থানীয় চায়ের দোকানি রশিদ ছুটে এসে বলেন,

‘কেউ দাঁড়িয়ে থেকো না! সবাই মিলে বাচ্চাগুলোকে বের করো।’

তিনি আরও কয়েকজনকে নিয়ে আহত শিশুদের উদ্ধার করতে থাকেন।

একজন অটোরিকশাচালক নিজের গাড়ি সামনে এনে বলেন,

‘আমার গাড়িতে তুলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

আরেকজন লোক চিৎকার করেন,

‘অ্যাম্বুলেন্স আসতে সময় লাগবে। আগে গাড়িতে তোলেন।’

সুরাইয়াকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তার বাবা হানিফ তখনও জানেন না কী হয়েছে।

ফোন আসে।

‘আপনি কি সুরাইয়ার বাবা?’

‘জি।’

‘আপনি দ্রুত হাসপাতালে আসেন।’

‘কী হয়েছে আমার মেয়ের?’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর শুধু বলা হয়,

‘আপনি আসেন।’

হানিফ দৌড়ে হাসপাতালে যান।

জরুরি বিভাগের সামনে মানুষের ভিড়। ভেজা স্কুলব্যাগ, কাঁদতে থাকা শিশু, উৎকণ্ঠিত অভিভাবক—সব মিলিয়ে এক অসহায় দৃশ্য।

হানিফ ছুটে এসে বলেন,

‘আমার মেয়ে কোথায়?’

কেউ উত্তর দেয় না।

একজন চিকিৎসক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন।

হানিফ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

‘ডাক্তার সাহেব... আমার মেয়েটা কেমন আছে?’

চিকিৎসক নিচু স্বরে বলেন,

‘আমরা চেষ্টা করেছি।’

হানিফ যেন কথাটার অর্থ বুঝতে চান না।

‘মানে?’

চিকিৎসক আর কিছু বলেন না।

হানিফ দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকেন।

তারপর হঠাৎ বলেন,

‘না... না, সুরাইয়া তো সকালে আমার সঙ্গে কথা বলে স্কুলে গেছে।’

একজন স্বজন তাকে ধরে ফেলেন।

হাসপাতালের অন্য পাশে রাইসার চিকিৎসা চলছে। তার মা বারবার চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইছেন,

‘আমার মেয়েটা হাঁটতে পারবে তো?’

চিকিৎসক বলেন,

‘এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। চিকিৎসা চলছে।’

মা মেয়ের হাত ধরে বসে থাকেন।

‘তুই শুধু চোখ খুল মা। পড়াশোনা না করলেও হবে। শুধু চোখটা খুল।’ কিন্তু সুরাইয়া আর চোখ খুলেনি কোনদিন। 

সুরাইয়ার জীবনে চিরদিনের ছুটির ঘন্টা বেজে গেছে ইতোমধ্যে। চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুরাইয়ার বাবা-মা।

সেদিন শুধু হাসপাতাল নয়, পুরো এলাকাই বদলে যায়।

শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে।

‘আমাদের নিরাপদ সড়ক চাই!’

‘পদচারী–সেতু চাই!’

‘আর কোনো সুরাইয়া নয়!’

বিক্ষুব্ধ এক শিক্ষার্থী বাসটির দিকে এগিয়ে যায়।

শ্রেয়া তাকে ধরে ফেলে।

‘ভাঙচুর করে কী হবে?’

ছেলেটি চোখ মুছতে মুছতে বলে,

‘তাহলে কী করব? আমাদের একজন মারা গেছে! আহতদের মধ্যে আর কতজন মারা যায় কে জানে? ’

শ্রেয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর বলে,

‘আমাদের এমন ব্যবস্থা চাই, যাতে আর কাউকে মরতে না হয়।’

কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন কথাটা শুনে বলেন,

‘শ্রেয়া ঠিক বলেছে। রাগের মাথায় বাস ভাঙলে সুরাইয়া ফিরে আসবে না। কিন্তু আমরা যদি নিরাপদ রাস্তার দাবি না তুলি, কাল আবার এমন হতে পারে।’

একজন অভিভাবক এগিয়ে এসে বলেন,

‘স্যার, আমরা শুধু সন্তানকে স্কুলে পাঠাই। কিন্তু স্কুলের সামনে যদি রাস্তা নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের দায়িত্ব কোথায় শেষ আর সরকারের দায়িত্ব কোথায় শুরু?’

কামাল উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

‘আমাদের সবার দায়িত্ব আছে।’

সেদিন রাতে রশিদ চায়ের দোকান বন্ধ করার সময় এক বাসচালককে বলছিলেন,

‘ভাই, আপনি গাড়ি চালান। আপনার হাতে কত মানুষের জীবন থাকে, কখনো ভেবে দেখেছেন?’

চালক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন,

‘ভাই, আমরা অনেক সময় সময়মতো পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়া করি।’

রশিদ মাথা নাড়েন।

‘সময়মতো পৌঁছানো দরকার। কিন্তু মানুষকে জীবিত পৌঁছানো তার চেয়েও দরকার।’

চালক কোনো উত্তর দেন না।

বৃষ্টিভেজা রাস্তায় তাকিয়ে থাকেন।

পরদিন স্কুলে সুরাইয়ার বেঞ্চটি খালি থাকে।

শ্রেয়া সেই বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

তারপর রাইসার পাশে বসে থাকা একটি ছোট মেয়েকে বলে,

‘রাস্তা পার হওয়ার সময় কখনো দৌড়াবে না। গাড়ি দেখলে দূরে থাকবে। বড়দের সঙ্গে রাস্তা পার হবে।’

মেয়েটি জিজ্ঞেস করে,

‘আপু, সুরাইয়া কি আর স্কুলে আসবে না?’

শ্রেয়া উত্তর দিতে পারে না।

জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।

তার চোখে আবার সেই বৃষ্টিভেজা বিকেল।

সেই বাস।

সেই চিৎকার।

সেই স্কুলব্যাগ।

আর একটি মেয়ে, যে ছুটির ঘণ্টা শুনে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিল।

সেদিনের পর থেকে ফেনি জেলার সিলোনিয়া হাইস্কুলের ছুটির ঘণ্টা প্রতিদিনই বাজে।

শিশুরা বের হয়।

অভিভাবকেরা অপেক্ষা করেন।

শিক্ষকেরা গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

বাসগুলোও চলে যায়।

কিন্তু প্রত্যেকবার কোনো বাস স্কুলের সামনে দিয়ে দ্রুত চলে গেলে শ্রেয়ার বুকটা কেঁপে ওঠে।

সে তখন ছোটদের বলে—

‘পিছনে দাঁড়াও। গাড়িকে আগে যেতে দাও।’

আর রাস্তায় থাকা চালকেরাও যদি এক মুহূর্তের জন্য সেই খালি স্কুলব্যাগটির কথা মনে করেন, হয়তো পা একটু ধীর হয়।

হয়তো একটি ব্রেক একটু আগে চাপা পড়ে।

হয়তো একটি শিশু বেঁচে যায়।

হয়তো কোনো এক বাবা সন্ধ্যায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার শুনতে পান—

‘আব্বু, আমি এসেছি।’

কারণ সড়কে একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কারও কাছে শুধু দুর্ঘটনা নয়।

কারও কাছে সেটিই হয়ে যায় সারা জীবনের শোক।

লন্ডন, ১৭ আগস্ট ২০২৬