বাংলাদেশ সংবাদ
রাজধানীতে বাড়ছে পরিচয়হীন লাশ, শেষ ঠিকানা জুরাইনের কবরস্থান
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৭ সেপ্টেম্বর: রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন মানুষের ভিড় বাড়লেও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এমন মানুষের মৃত্যু ঘটছে, যাদের পরিচয় পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। সড়কের পাশে, ফুটপাত, হাসপাতালের সামনে, খালপাড় কিংবা নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাত মরদেহ। পরে পুলিশি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনের সন্ধান না মিললে এসব মরদেহের শেষ ঠিকানা হচ্ছে বেওয়ারিশ কবর।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন নথি ও থানার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। তবে বছরের প্রথম আট মাসের পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় মোট সংখ্যা কত, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
শাহবাগ এলাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় অসুস্থ, ভবঘুরে, দুর্ঘটনার শিকার কিংবা স্বজনহীন মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় অনেক সময় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি বছরের মে মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে আনুমানিক ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগস্টে একই এলাকায় পাওয়া যায় আনুমানিক ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ। পুলিশ তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়ে তথ্য প্রকাশ করেছিল।
বিশেষ করে ১২ আগস্টের ঘটনাটি পরিবার ও স্বজনহীনতার নির্মম বাস্তবতা সামনে আনে। পরিবারের সদস্যরা ওই কিশোরীকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সময় তারা সরে যান। পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সাধারণত সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরিচয় শনাক্তের জন্য মরদেহের ছবি, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে ডিএনএ নমুনাও নেওয়া হয়। পাশাপাশি স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানোর মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলে।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও স্বজনের সন্ধান না মিললে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। কাফন, জানাজা ও দাফতের পর অনেকের শেষ ঠিকানা হয় জুরাইন কবরস্থান।
এখানেই তৈরি হয় আরেকটি জটিলতা। কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার পরে যদি জানতে পারে যে তার স্বজনের মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে, তখন কবর শনাক্ত করা এবং পরিচয় নিশ্চিত করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচয় শনাক্তে থানাগুলো নিয়মিত মরদেহের ছবি ও বিবরণ প্রকাশ করে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা, হাসপাতালের মর্গ, থানা এবং ডিএনএ তথ্যের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর করা গেলে অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে।
একটি অজ্ঞাত মরদেহের পেছনে যে একটি পরিবার থাকতে পারে, সেটিই এই সংকটের সবচেয়ে মানবিক দিক। হয়তো কোনো বাবা সন্তানকে খুঁজছেন, কোনো স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায় আছেন, কিংবা কোনো সন্তান দিনের পর দিন ফিরে আসার পথ দেখছে। অথচ সেই মানুষটির মরদেহ হয়তো ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে এমন এক কবরে, যেখানে তার নাম-পরিচয়ও নেই।